বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন

লাশ চুরির আতঙ্কে কবরস্থানে রাত জাগেন ৮০ বছরের মোজাফ্ফর

মোঃ বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:: ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় কবর থেকে মরদেহ চুরির ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। বিশেষ করে সদ্য দাফন করা কবরগুলো নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনেরা। এমন পরিস্থিতিতে রাণীশংকৈল উপজেলার মীরডাঙ্গী মহেশপুর গোরস্থানে স্বেচ্ছায় পাহারার দায়িত্ব নিয়েছেন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ মোজাফ্ফর হোসেন ভাদ্রু। বয়সের ভার ও শারীরিক দুর্বলতাকে উপেক্ষা করে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই তিনি হাজির হন কবরস্থানে। গভীর রাত পর্যন্ত টহল দিয়ে পাহারা দেন কবরগুলো।

স্থানীয় লোকজন জানান, মহেশপুর গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা মোজাফ্ফর হোসেন দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ জীবনযাপন করেন। দিনের বেলায় তিনি কবরস্থানের আশপাশে গরু-ছাগল চরান। তবে সন্ধ্যা হলেই যেন বদলে যায় তার দায়িত্ব। হাতে একটি লাঠি, সঙ্গে টর্চলাইট নিয়ে কবরস্থানের চারপাশে টহল দিতে দেখা যায় তাঁকে। অনেক সময় রাতভর একাই অবস্থান করেন সেখানে।

সম্প্রতি জেলার কয়েকটি এলাকায় কবর খুঁড়ে মরদেহ চুরির অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নতুন কবরগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন মৃত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। সেই উদ্বেগ থেকেই নিজের উদ্যোগে কবরস্থান পাহারার সিদ্ধান্ত নেন মোজাফ্ফর হোসেন।

গত কয়েক দিন ধরে প্রতিরাতে তাঁকে কবরস্থানে পাহারা দিতে দেখা গেছে। কেউ কাছে এলে সতর্ক হয়ে ওঠেন তিনি। গভীর রাতে কবরস্থানের আশপাশে অচেনা কাউকে দেখলে খোঁজখবরও নেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো ধরনের পারিশ্রমিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই শুধুমাত্র মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এ কাজ করছেন।
মোজাফ্ফর হোসেন ভাদ্রু বলেন, মানুষ মারা যাওয়ার পরও যদি কবর নিরাপদ না থাকে, তাহলে এর চেয়ে কষ্টের কিছু হতে পারে না। আমরা জীবিতদের যেমন সম্মান করি, মৃতদেরও তেমন সম্মান দেওয়া উচিত। যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন কবরস্থান পাহারা দিয়ে যেতে চাই। তাঁর এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এলাকাবাসী বলছেন, বর্তমানে সমাজে যেখানে মানুষ নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে ব্যস্ত, সেখানে একজন বৃদ্ধ মানুষের এমন দায়িত্ববোধ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

মীরডাঙ্গী মহেশপুর গোরস্থান দারুল উলুম নুরানী মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আবদুল মমিন বলেন, ভাদ্রু চাচা দিনে কবরস্থানের আশপাশে গরু-ছাগল চরান। আবার সন্ধ্যা হলেই চলে আসেন কবর পাহারা দিতে। বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর এই সাহস ও দায়িত্ববোধ সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজে মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এমন উদাহরণ খুব কম দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলায় কবরস্থানে একা পাহারা দেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। তারপরও ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে মোজাফ্ফর হোসেন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। কেউ কেউ রাতের কিছু সময় তাঁর সঙ্গে থেকে পাহারা দিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সচেতন মানুষ এগিয়ে এলে কবরস্থানসহ ধর্মীয় স্থানগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব। তারা মনে করছেন, মোজাফ্ফর হোসেনের মতো মানুষদের সামাজিকভাবে সম্মানিত করা উচিত।

একজন বৃদ্ধ মানুষের এই নীরব দায়িত্ব পালন এখন রাণীশংকৈলে মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কবরস্থানের নির্জন অন্ধকারে হাতে টর্চ আর লাঠি নিয়ে তাঁর টহল যেন শুধু কবর পাহারা নয়, বরং মৃত মানুষের প্রতি সম্মান আর মানবিক মূল্যবোধ রক্ষারও এক প্রতীক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com