রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
জগতে ‘মূর্খ’ শব্দের কোনো একক বা সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। একজনের চোখে যিনি মূর্খ, অন্য এক বিশাল গোষ্ঠীর কাছে তিনিই হয়তো পরম পূজনীয় ও জ্ঞানী। আপেক্ষিকতার এই দোলাচলেই মানবসমাজ আবর্তিত। তবে স্থান-কাল-পাত্রভেদে মূর্খতার স্বরূপ এবং সমাজ জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব চিরন্তন। সনাতন ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য- সবখানেই এই ‘মূঢ়’ বা মূর্খ মানসিকতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা আজকের আধুনিক সমাজেও সমভাবে প্রযোজ্য।
আধ্যাত্মিক ও জাগতিক প্রেক্ষাপট: সংসারের ঘানি ও ‘কলুর বলদ’
শ্রীমদ্ভগবদগীতার সপ্তম অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ‘মূঢ়’ শব্দের অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে, যারা নিজের ভালো-মন্দ বিচার করতে না পেরে পরম মুক্তির পথ থেকে বিমুখ থাকে, তারাই মূঢ়। গীতায় বলা হয়েছে-
“মূঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসম্পন্ন, সেই সমস্ত দুষ্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।”
এই মূঢ়তার জাগতিক রূপটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন যারা তেলের ঘানির চোখ-বাঁধা বলদের মতো নির্বিকার চিত্তে দিনরাত সংসারের বোঝা টেনে চলেছেন। প্রাচীনকালে ঘানির বলদ যেমন সারাজীবন মনিবের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শেষ বয়সে জরাজীর্ণ হয়ে কসাইয়ের কাছে বিক্রি হয়ে যেত, আধুনিক যুগেও অনেক পুরুষ বা সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জীবন অবিকল এক। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের ভরণপোষণের ঘানি টানতে টানতে কখন যে তাদের জীবন-যৌবন হারিয়ে যায়, তারা নিজেরাও তা টের পান না। অথচ, এই কঠোর পরিশ্রমী মানুষদেরই অকৃতজ্ঞ সমাজ অনেক সময় ‘কলুর বলদ’ বলে উপহাস করে। সাধক রামপ্রসাদ সেনের গানেও এই আকুলতা ফুটে উঠেছে: “মা, আমায় ঘুরাবি কত? কলুর চোখঢাকা বলদের মত।”
মূর্খতার প্রকারভেদ ও ভর্তৃহরির ‘নীতিশতক’
সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘নীতিশতক’-এ কবি ও রাজা ভর্তৃহরি মূর্খদের মনস্তত্ত্ব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, মূর্খ মূলত পাঁচ প্রকার:
১. স্বল্পজ্ঞানী, ২. পণ্ডিতম্মন্য (নিজেকে পণ্ডিত ভাবা), ৩. অজ্ঞানী, ৪. মূঢ়জন এবং ৫. অপরিনামদর্শী।
ভর্তৃহরি তাঁর গ্রন্থে স্বল্পজ্ঞানীদের অহংকারকে সবচেয়ে বড় ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে লিখেছেন-
“অজ্ঞ ব্যক্তিকে বোঝানো সহজ, বিশেষজ্ঞ বা জ্ঞানীকে বোঝানো আরও সহজ; কিন্তু যে ব্যক্তি সামান্য জ্ঞান নিয়ে অহংকারে মত্ত, তাকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এলেও সন্তুষ্ট বা আলোর পথ দেখাতে পারেন না।”
এই স্বল্পজ্ঞানীরা নিজেরা যে জানে না, সেটিও তারা বোঝে না। ফলস্বরূপ, যেকোনো বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ছাড়াই তারা সমাজ ও পরিবারে অনধিকার চর্চা করে প্রতিনিয়ত জটিলতার সৃষ্টি করে।
অসম্ভব যা, তাও সম্ভব; কিন্তু…
ভর্তৃহরি তীব্র উপমার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, প্রকৃতির অসম্ভবকেও হয়তো সম্ভব করা যায়, কিন্তু জেদি ও আগ্রহহীন মূর্খের মন জয় করা অসম্ভব। তাঁর শ্লোকের মর্মার্থ হলো:
কুমিরের ধারালো দাঁতের ফাঁক থেকে বলপ্রয়োগে মণি উদ্ধার করা সম্ভব।
বিক্ষুব্ধ সমুদ্র সাঁতরে পার হওয়া কিংবা ক্রুদ্ধ সাপকে ফুলের মতো মাথায় ধারণ করাও হয়তো সম্ভব।
তীব্র চেষ্টায় বালু থেকে তেল নিষ্কাশন কিংবা মরুভূমির মরীচিকায় তৃষ্ণা মেটানোও হয়তো অসম্ভব নয়।
কিন্তু জ্ঞানের প্রতি আগ্রহহীন মূর্খের চিত্তকে কোনোভাবেই জয় করা বা আলোর পথে আনা সম্ভব নয়। তারা যে ডালে বসে, না বুঝে সেই ডালই কাটতে থাকে। হিতৈষী কেউ সতর্ক করলে তাকে শত্রু ভাবে এবং চূড়ান্ত বিপর্যয়ে পড়ে ভাগ্যকে দোষারোপ করে।
সমাজ-সংসারের বৈপরীত্য ও আমাদের করণীয়
জগতে মানুষের বোধশক্তি এক নয়। এর পেছনে পূর্বজন্মের সুকৃতি বা সংস্কারের প্রভাব রয়েছে। আর এ কারণেই সমাজে দেখা যায়, কেউ দুধ বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে মদ কিনে খায়, আবার কেউ মদ বিক্রির টাকা দিয়ে দুধ কিনে শরীর গঠন করে। সৎ মানুষের ঘরে কুলাঙ্গার আর দুর্জনের ঘরে সাধু পুরুষের জন্ম হওয়াও এই বৈচিত্রেরই অংশ। ঈশ্বর মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু কেউ যদি নিজের বুদ্ধির তালা খুলতে না চায়, তবে সমাজের কাছে সে ‘ভাঙা কুলা’র মতো মূল্যহীন হয়ে পড়ে- যাকে শুধু ছাই বা ময়লা ফেলার সময় মনে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানীদের একটি প্রচলিত ও গভীর মন্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
“মূর্খের সহিত মিত্রতা করে স্বর্গে যাওয়ার চাইতে শিক্ষিত ও সুশীল লোকের সহিত নরকে যাওয়াও উত্তম। কেননা, অশিক্ষিত ও কণ্ডজ্ঞানহীন লোক স্বর্গে গেলেও নিজেদের আচরণ দিয়ে স্বর্গকে দ্রুত নরকে পরিণত করবে। পক্ষান্তরে, সুশিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষ নরকের যন্ত্রণাকেও তাদের জ্ঞান ও সুরুচি দিয়ে ধীরে ধীরে সহনীয় ও সুখকর করে তুলতে পারেন।”
উপসংহার:
মূর্খ মানুষের সংস্পর্শে এলে সে সমাজকে টেনে নিজের নিম্নস্তরে নামিয়ে আনে। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে প্রথমত অজ্ঞদের সংশোধনের আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। তবে সেই চেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তবে আত্মিক শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে এই সমাজস্বীকৃত অহংকারী মূর্খদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাই শ্রেয়। জ্ঞানহীন অন্ধকারের চেয়ে সচেতন একাকীত্বই মানব সভ্যতার জন্য বরাবরের মতো কল্যাণকর।