রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন
অনলাইন নিউজ ডেস্কঃ
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ হামলা চালিয়ে এই উন্মাদনার পারদ জ্বালিয়ে দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন সব বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব সহ প্রায় সব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তারা ইরানকে পাল্টা হুমকি দিয়েছে। বলেছে, ইরান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। এসব দেশের জবাব দেয়ার অধিকার আছে।
ফলে ওইসব দেশ যদি পাল্টা আঘাত হানে ইরানে, তাহলে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। এ জন্য ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছে সচেতন মহল। যখন পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল, তখনই এই হামলার পরিকল্পনা সাজানো হয়। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া।
রাশিয়ার দমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেছেন- ‘শান্তির দূত তার আসল চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন এবার।’ যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে অনেক দেশ। উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন দেশ ও মহল থেকে। ইরানে হামলার আগেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। যেমনটি সতর্কতা দেয়া হয়েছিল, ঠিক সেরকমই মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে যুদ্ধপরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে আক্রান্ত হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে হামলা করবে।
গতকাল ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পর ইরান সেই কাজটিই করেছে। তারা সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের দক্ষিণে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৬০ জন। বাহরাইন নিশ্চিত করেছে যে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের হেডকোয়ার্টারে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে। ইরানের এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে এসব দেশ। তারা বলেছে, ইরানের এসব হামলার জবাব দেয়ার অধিকার তাদের আছে। ইরান এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। ওদিকে হামলার পর ইরানি জনগণকে উসকে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তাদেরকে ক্ষমতা দখল করতে উৎসাহিত করেছেন। বলেছেন, আমরা যেখানে শেষ করবো, সেখান থেকে তোমাদেরকে সরকারের দখল নিতে হবে। একজন প্রেসিডেন্ট অন্যদেশের বিরুদ্ধে এভাবে উস্কানি দিতে পারেন কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে।
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাসিরজাদেহ ও গার্ড কমান্ডার পাকপুর নিহত: ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং রেভ্যুলুশনারি গার্ডসের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। তিনটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে এ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আহত হয়েছেন কিনা তা অনুসন্ধান করছে ইসরাইল। এ খবর প্রকাশের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার বলেছে, আমরা হয়তো কয়েকজন কমান্ডারকে হারিয়েছি। তবে সেটা অতো বড় কোনো সমস্যা নয়।
এনবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলাকে বিনা উস্কানিতে, অবৈধ হামলা বলে আখ্যায়িত করেন। বলেন, এই হামলা চরমভাবে অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষায় কারও সহায়তার প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদেরকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলাকে তাদের আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন।
ইইউ নেতাদের সর্বোচ্চ সংযম আহ্বান: ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা বলেছেন, ইরান সম্পর্কিত সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আমরা সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে। তারা আরও জানান, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থানরত ইইউ নাগরিকদের সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ইইউ’র পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কাল্লাস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের মধ্যেও ইইউ কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধান করছে। তিনি বলেন, ইইউ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করেছে। আমি ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার ও অঞ্চলের অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা আরব অংশীদারদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছি। তিনি আরও বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রক্ষা করা অগ্রাধিকার। ইইউ’র কনস্যুলার নেটওয়ার্ক নাগরিকদের অঞ্চল ছাড়তে সহায়তা করছে এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
রেড ক্রস প্রধানের সতর্কবার্তা: আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রেসিডেন্ট মিরজানা স্পোলজারিক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা বিপজ্জনক বিশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, এই সামরিক উত্তেজনা পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের জন্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের আইন মানা বাধ্যতামূলক, এটি কোনো বিকল্প নয়। আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতে জেনেভা কনভেনশন প্রযোজ্য। হাসপাতাল, বাড়িঘর ও স্কুলের মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে। চিকিৎসাকর্মী ও জরুরি সেবাদাতাদের নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
একতরফা সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর: স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত ও বৈরী করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, আমরা অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের দাবি জানাই এবং আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণভাবে মেনে চলার আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে তিনি ইরানের সরকার ও রেভল্যুশনারি গার্ডের কর্মকাণ্ডও প্রত্যাখ্যান করেছেন।