রবিবার, ১২ Jul ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন

‘পাকিস্তান ভাঙার ইচ্ছা ছিল না শেখ মুজিবের, তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি’: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কোনো ইচ্ছা কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার কোনো বাসনা শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না। আর এই কারণেই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত ক্র্যাকডাউনের আগে তাজউদ্দীন আহমদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।

শনিবার (১১ জুলাই) ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)’ আয়োজিত ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন।

সংকটে দিশেহারা জাতিকে পথ দেখান জিয়াউর রহমান
মেজর (অব.) হাফিজ সেদিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “তাজউদ্দীন সাহেব ২৫শে মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বলেছিলেন- পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে, এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়। কিন্তু শেখ সাহেব তখন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না, পাকিস্তান ভাঙতে আমার কোনো অবদান থাকুক এটি আমি চাই না।’ ফলশ্রুতিতে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।”

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর সেই ভয়াবহ ও বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে দেশের মানুষ যখন সম্পূর্ণ দিশেহারা ও অবদমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক তখনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট অসীম সাহসের সাথে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই চরম সংকটময় ও ঐতিহাসিক মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা দিশেহারা জাতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে তীব্রভাবে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। স্পিকার জোর দিয়ে বলেন, “এটিই হলো আমাদের ইতিহাসের প্রকৃত সত্য।”

মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি জনতার যুদ্ধ
আলোচনা সভায় মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল মূলত একটি ‘জনতার যুদ্ধ’। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় এসে একটি বিশেষ গোষ্ঠী ইতিহাস বিকৃতির আশ্রয় নেয়। তারা শুধু ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে এককভাবে স্বাধীনতার পুরো কৃতিত্ব নিজেদের পকেটে পুরতে চেয়েছিল, যা ছিল চরম অন্যায়। তিনি মন্তব্য করেন, রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব ‘হাইজ্যাক’ বা ছিনতাই করেন এবং নিজের দলের নেতা ছাড়া অন্য কাউকেই কোনো কৃতিত্ব দিতে চান না।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় প্রতিরোধ
মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অসামান্য ও গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এই রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন কর্মরত ছিল। দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত এই ব্যাটালিয়নগুলো কোনো পূর্বপরিকল্পনা কিংবা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ছাড়াই পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা সাধারণ জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। বীরত্বপূর্ণ এই প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধই ছিল পরবর্তী ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ও চালিকাশক্তি।

জিয়াউর রহমানের অনুপ্রেরণায় সেনাবাহিনীতে যোগদান
নিজের সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে স্পিকার জানান, তিনি মূলত ফুটবল খেলার টানেই সেনাবাহিনীতে এসেছিলেন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের বিশেষ অনুপ্রেরণাতেই তিনি শেষ পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, “আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহান ঘোষক ও এদেশের মহান রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে, যিনি আমাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলেন।”

এ সময় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান সংগঠক মেজর আব্দুল গনি এবং ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের রেজিমেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা অত্যন্ত কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। পরিশেষে, সেনাবাহিনীর চিরাচরিত ঐতিহ্য বজায় রেখে সৈনিকদের সাথে অফিসারদের সম্পর্কের যে আত্মিক বন্ধন, তা পুনরায় আরও শক্তিশালী করার জন্য তিনি সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com