শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪৫ অপরাহ্ন

নেপালের বন্যার পানি গঙ্গা হয়ে বাংলাদেশেও পৌঁছাতে পারে?

অনলাইন ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: নেপালের তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দুই হাজারের বেশি মানুষ। হিমবাহ ধস ও নদীর প্রবাহ আটকে সৃষ্ট এই পাহাড়ি ঢল ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী হয়ে ভারতের গঙ্গা অববাহিকায় প্রবেশ করছে। ফলে গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে এর প্রভাব বাংলাদেশেও পৌঁছাতে পারে। তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়ায় নেপালের এই বন্যার পানি বাংলাদেশে সরাসরি বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করার আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন ভূ-তত্ত্ববিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি না থাকলেও উজানে বৃষ্টিপাত এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির স্তর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।

প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে কাদা, পাথর ও বিপুল জলরাশি প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। ত্রিশূলী নদীর একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পাহাড়ি ঢল ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী হয়ে নারায়ণী নদী অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ভেসে যায় সেতু, সড়ক, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন অবকাঠামো। অনেক এলাকায় নদীর স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণকেন্দ্রও ধ্বংস হয়ে যায়।

ভূ-তত্ত্ববিদদের ভাষায়, এ ধরনের আকস্মিক বন্যাকে ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা ‘গ্লফ’ বলা হয়। হিমবাহ ধস, বরফ ও পাথরে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়া এবং পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল জলরাশি নেমে আসার ফলে অল্প সময়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। রাসুয়ার এবারের বন্যাতেও এমন একটি প্রক্রিয়া কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেপালের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি পানিপ্রবাহগত সংযোগ রয়েছে। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী হয়ে পানি নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় পড়বে। পরে গণ্ডক ভারতের বিহার দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গায় মিশবে। গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে সেই পানি ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। তবে বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন বলেন, নেপাল থেকে নেমে আসা পানি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময় এর তীব্রতা অনেকটাই কমে যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, নেপালের সংশ্লিষ্ট এলাকায় একাধিক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এসব হ্রদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ভারত থেকে বন্যা ও নদীর পানির স্তরসংক্রান্ত তথ্যও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেনও সরাসরি বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না। তাঁর মতে, উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানির গতি অনেকটাই কমে যাবে। তবে আগামী কয়েক দিনে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানির তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজ, তিস্তা ব্যারাজসহ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির স্তরও নজরদারিতে রাখার কথা বলেছেন এই গবেষক।

আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপির এক যৌথ গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলের তিব্বত, নেপাল ও ভারতের অববাহিকায় ৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য এবারের বন্যায় তাৎক্ষণিক বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা কম হলেও ঘটনাটি হিমালয়-নির্ভর নদী অববাহিকার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। তাই বন্যার পানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই উজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভুল ও দ্রুত তথ্য পাওয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com