বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ০২:২৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন ডেস্ক : রাজনীতি চিরকালই পরিবর্তনশীল । সেই ছোটবেলায় ইতিহাস বইয়ে পড়তাম, কোনো একটি সাম্রাজ্যের উত্থান হলে সেই সাম্রাজ্য একদিন চরম শিখরে আরোহণ করে । তারপর একদিন তার পতনও হয়। এ হলো ইতিহাসের গতিসূত্র ।
মোগল সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন—সব কিছুরই উত্থান এবং অবসানের ইতিহাস আমরা পড়েছি ।
২০১৪ সালে যখন নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন মনে হয়েছিল ওই অতি ভৈরব হরষে এক মহা শক্তিমান সুপারম্যান দিল্লির মসনদ দখল করলেন । অনেকেই বলেছিল, অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন জেমস বন্ড হতাশ লন্ডনবাসীকে হতাশামুক্ত করার জন্য এসেছিলেন, ঠিক সেভাবে নরেন্দ্র মোদিও ভারতবাসীর অবসাদ দূর করার জন্য এসেছেন । তখন তো মনমোহন সিংয়ের সরকারের নীতিপঙ্গুতা, দুর্নীতি—এসবে মানুষ ভীষণভাবে ক্লান্ত ।
মানুষ তখন কংগ্রেসের হাত থেকে ভারতবাসীকে মুক্ত করতে ব্যস্ত ছিল । এরপর নরেন্দ্র মোদি দুটি ইনিংস অতিবাহিত করেছেন । এবার এসেছে নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় ইনিংসের নতুন অধ্যায় । তবে যে বিজেপি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, যে বিজেপির একাই দেশ চালানোর, সরকার চালানোর ক্ষমতা ছিল, সেই বিজেপি আজ কোয়ালিশন যুগে প্রবেশ করেছে ।
বিজেপি এখন ২৪০টি আসনের সরকার । নীতিশ কুমারের জেডিইউ এবং চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশমের সমর্থন নিয়ে সরকার চলছে । যদিও শপথগ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি তাঁর রাজনৈতিক আচরণের মধ্য দিয়ে কখনো সেটা বুঝতে দিতে চাইছেন না । তিনি চাইছেন, কোয়ালিশন ধর্ম পালন করা মানে আত্মসমর্পণ নয় । যেভাবে অটল বিহারি বাজপেয়ির কোয়ালিশন সরকার চলেছিল, সেভাবে তিনি চালাতে চান না ।
কেননা সে ক্ষেত্রে সংখ্যা অনেক কম ছিল বাজপেয়ির। এখানে ঠিক ততটা কম সংখ্যাও বিজেপির নেই । আর সেই কারণে যখন সরকার গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন অনেকে ভেবেছিল, নীতিশ কুমার হয়তো রেল মন্ত্রণালয় চাইবেন, চন্দ্রবাবু নাইডু স্পিকার পদ চাইবেন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে বিহারকে, অন্ধ্র প্রদেশের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে । এখন পর্যন্ত কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই আমরা দেখতে পাইনি ।
নরেন্দ্র মোদি ইচ্ছামতো সরকার চালাতে পারছেন নাআর্থিক সাহায্য নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে । গোটা দেশের মধ্যে বিহারকে আলাদা করে একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা, সেটাও কিন্তু নরেন্দ্র মোদি করতে রাজি হননি । কাজেই নরেন্দ্র মোদি এটা দেখাতে চাইছেন যে এই সরকার শক্তিশালী সরকার । এই সরকার মাথা ঝোঁকাতে রাজি নয় । তবে বাস্তব চিত্রটা ঠিক তা নয় । যত দিন যাচ্ছে, ক্রমেই সেটা স্পষ্ট হচ্ছে । বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নরেন্দ্র মোদির সেই দুর্বলতা, অপারগতা এবং আগের মোদি আর আজকের মোদির কার্যকলাপের মধ্যে তফাতগুলো তুলে ধরতে শুরু করেছে । যেমন—সংরক্ষণের বিষয় । গোটা দেশে ওবিসি কতজন আছে, তাদের মধ্যে কী কী শ্রেণি বিভাজন আছে, এগুলোর ব্যাপারে একটা সেন্সাস রিপোর্ট প্রকাশ করা—এই দাবি নীতীশ কুমার এবং বহু বিরোধী নেতা করে আসছেন । কিন্তু নরেন্দ্র মোদি এই রিপোর্ট প্রকাশ করতে এখন পর্যন্ত রাজি নন । বিজেপি দলের পক্ষ থেকেও এটাকে প্রকাশ করার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান কখনোই নেওয়া হয়নি ।
অনেকেই বলছে, ওবিসি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়ে গেলে যে ওবিসির পরিসংখ্যান অনুমান করা হচ্ছে, তাতে গোটা দেশে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংঘাত আরো বাড়বে । ওবিসিদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে যে তখন তাদের জন্য যদি কোটা করতে হয়, তাহলে সেই সংরক্ষণে অন্যান্য জাতির অবস্থা আরো শোচনীয় হবে । কিন্তু রিপোর্ট প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো সবই অনুমানভিত্তিক এবং বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীর পর্যালোচনায় ।
এখন নীতীশ কুমারের সমর্থন নিয়ে সরকার চালাতে গিয়ে হয়তো রেল মন্ত্রণালয় নীতীশ কুমার চাননি, কিন্তু এই ওবিসি যেহেতু নীতীশ কুমারের একটা ভোটব্যাংক এবং নীতীশ কুমার নিজে কুর্মি সম্প্রদায়ের নেতা এবং ওবিসিদের জন্য তিনি লড়ছেন, এই বার্তা দিয়ে তিনি রাজনৈতিক পুনরুত্থানের চেষ্টা করছেন; যদিও নীতীশ কুমার এবং বিজেপি একসঙ্গে আছে । বিজেপির লক্ষ্য হচ্ছে, বিহারে বিজেপির এককভাবে শ্রীবৃদ্ধি এবং নীতীশ কুমারের জেডিইউ-কে কার্যত শেষ করে দিয়ে বিজেপি যাতে এককভাবে বিহার দখল করতে পারে । এর জন্য উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ, ভূমিহার, ক্ষত্রিয় তাদের অসন্তুষ্ট করে, শুধু ওবিসি ভোটব্যাংক নিয়েও আবার বিজেপির পক্ষে বিহারের রাজনীতি করা কেন, উত্তর প্রদেশের রাজনীতি করাও মুশকিল ।
নীতীশ কুমার প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা না করে, ভেতরে ভেতরে নরেন্দ্র মোদিকে এ ব্যাপারে চাপ দিতে শুরু করেছেন । নরেন্দ্র মোদি এখন এই ওবিসির ভিত্তিতে জনগণনার যে রিপোর্ট, সেটা প্রকাশ করার ব্যাপারে অনেকটা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন । এখন এই রিপোর্ট প্রকাশিত হলে তার কী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হবে, সেটা এখন পর্যন্ত অস্পষ্ট । মণ্ডল কমিশনের সময় আমরা দেখেছি, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের কী অবস্থা হয়েছিল সেই মণ্ডল কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে! তখনই তো বিজেপি মণ্ডলের বিরুদ্ধে মণ্ডলের রাজনীতি শুরু করেছিল ।
সুতরাং এখন বলা যায়, নরেন্দ্র মোদি ইচ্ছামতো সরকার চালাতে পারছেন না । আর একটা দৃষ্টান্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে যে সরকারের কাজে গতি এবং উত্কর্ষ বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উপসচিব, যুগ্ম সচিব—এসব পদে সরাসরি নিয়োগ করা হবে বলে নরেন্দ্র মোদি ভেবেছিলেন এবং সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন । কিন্তু বিরোধী এবং শরিকরা তাতে এমন চাপ দিল যে এই সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদিকে বাতিল করতে হয়েছে ।
মোদি সরকারের কর্মীবর্গ দপ্তরের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে এক চিঠিতে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছেন । সেই চিঠিতে কী বলা হয়েছে? বলা হয়েছে যে সংরক্ষণের নিয়ন্ত্রণ মেনে নতুন করে তাদের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় । এই সংরক্ষণের দাবি মেনে কর্মী নিয়োগ—নরেন্দ্র মোদি সব সময় মনে করছিলেন যে এটা বাধ্যতামূলক করলে, অনেক সময় যাদেরকে নেওয়া হবে, সেসব কর্মীর উত্কর্ষের প্রতি অবহেলা করা হবে ।
অর্থাৎ একদিকে সংরক্ষণ, আরেক দিকে সরকারি কর্মচারীদের যে উত্কর্ষ, সেটার মধ্যে একটা ভারসাম্য করার কথা তিনি বরাবর বলে এসেছেন । এই কারণে নরেন্দ্র মোদি ল্যাটারাল এন্ট্রি ইন দ্য ডেমোক্রেসিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন । অর্থাৎ সবাই যে আইএএস অফিসার বা সবাই যে সরকারি কর্মচারী, তা নয় । কিন্তু কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে দক্ষ এবং যোগ্য এমন লোক, যারা সরকারি আইএএস বা কোনো ক্যাডারের কর্মী নন, তাঁদেরও তিনি সরাসরি নিয়োগ করার পক্ষে ছিলেন। তবে ক্রমেই তাঁকে এখন শরিকি চাপে এবং বিরোধীদেরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের জন্য এই ল্যাটারাল এন্ট্রি বন্ধ রেখে সংরক্ষণভিত্তিক নিয়োগের দিকে তাঁকে যেতে হচ্ছে ।
এবার আসা যাক দুটি বিল নিয়ে । একটি বিলের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়টিও যুক্ত । ওয়াকফ সংশোধনী বিল । মুসলমানদের ওয়াকফ সম্পত্তিতে অমুসলিমদের হস্তক্ষেপ ভীষণভাবে বিতর্ক তৈরি করেছে । ওয়াকফ সম্পত্তির গণতান্ত্রিকীকরণের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এই বিল উত্থাপন করে সংসদীয় অধিবেশনে । তখনই বিরোধীরা প্রতিবাদ জানায় । কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, এআইএমআইএম ছাড়া শরিক দল টিডিপি এবং জেডিইউ-ও সেই বিরোধিতায় শামিল হয়ে যায় ।
মূল অভিযোগটা কী? মূল অভিযোগটা হলো, বিলটা অসাংবিধানিক এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী । কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রী হিরেন রিজেজু এটাকে আরো বিবেচনার জন্য দুটি সংসদের লোকসভা এবং রাজ্যসভার দুটি পক্ষেরই যুগ্ম একটি কমিটি সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেন । সেই কমিটিতে আবার বিজেপিই সংখ্যাগরিষ্ঠ ।
আগে সিলেক্ট কমিটি বা সংসদীয় কমিটির কাছে বিল পাঠানোর রেওয়াজই ছিল না । নরেন্দ্র মোদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব বিলই পাস করিয়ে নিতে পারতেন । এবারে পুনর্বিবেচনার জন্য গেলেও সেখানে কমিটিতে যেহেতু বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সেটা সরকারের পক্ষে সেই কমিটিতেও পাস করানো কঠিন ছিল না । কেননা ১০ বছরে মোদি মাত্র দুইবার বিবেচনার জন্য দুটি বিল সিলেক্ট কমিটিতে পাঠিয়েছিলেন । ২০১৬ সালে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বিল আর ২০১৯ সালে তথ্য সুরক্ষা বিল । এখন ওয়াকফ সংসদীয় বিলের খসড়ায় দুজন নারী এবং দুজন অমুসলমানকে রাখা হয় । এখন বিরোধীরা সেখানেও প্রশ্ন তোলে যে অন্য কোনো ধর্মের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ভিন্ন ধর্মের কারো উপস্থিতি নেই, তাহলে ওয়াকফ বোর্ডে অন্য ধর্মের লোকদের উপস্থিতি কেন?
এই সহজ প্রশ্নগুলো কিন্তু আগে উঠত না । এখন এই সহজ প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হতে শুরু করেছে । ব্রডকাস্ট বিলের ক্ষেত্রেও প্রবল সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখে পড়েছে সরকার এবং খসড়া বিলটা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছে । বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, সংবাদপত্র এবং সংবাদমাধ্যমে লাগাম পড়ানোই ওই বিলের উদ্দেশ্য । গত বছরের নভেম্বরে ওই খসড়া তৈরি করে সরকার জনসাধারণের অভিমত জানতে চেয়েছিল ।
সত্যি কথা বলতে কি, অর্থমন্ত্রীও এবার বাজেট পেশ করার সময় হিমশিম খেয়েছেন । এর কারণ আপ কি বার, চার শ পার—এই স্লোগান নরেন্দ্র মোদি দিয়েছিলেন । নরেন্দ্র মোদি ভেবেছিলেন যে এবার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বেসরকারীকরণের পথে নেওয়া যাবে । অর্থাৎ ৫১ শতাংশেরও নিচে সরকারের শেয়ারকে আনা হবে । কিন্তু সেটা করার ঝুঁকি এই সরকার আর নিতে পারল না । কেননা সেই সংখ্যাটা নেই বলে ।
সম্পত্তি করের যে নিয়ম, সেই নিয়মগুলোরও হেরফের ঘটানোর ক্ষেত্রে সরকারের একটা পরিকল্পনা ছিল । এতে সরকারের বেশি লাভ হবে। সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার কথা না ভেবে সরকার নিজের স্বার্থ ভাবছে । এই অভিযোগ তোলায় সেই সিদ্ধান্তও নরেন্দ্র মোদির পক্ষে কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি । এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, একের পর এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নরেন্দ্র মোদির সমস্যা হচ্ছে ।
সর্বশেষ উদাহরণ বলি, আরএসএসকর্মীদের সরকারে নিয়োগের ব্যাপারে সরকার ঠিক করেই ফেলেছিল যে যোগ্যতাসম্পন্ন আরএসএসের ব্যক্তিদের সরকারের বিভিন্ন জায়গায় প্রবেশ দেওয়া হবে । এটা বিজেপির কথায় আরএসএসের পুরনো রণকৌশল । এটাকে বিরোধীরা বলে, আরএসএস ইন ডকট্রিনেশন পদ্ধতি । কিন্তু শোরগোল তুলে দিয়েছে শরিক দলগুলোও । তো এই পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদিকেও কিন্তু ধীরে চলো নীতিই নিতে হচ্ছে ।