শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন
জনস্বাস্থ্য ও অপরাধ ডেস্ক ॥
নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার যেখানে সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি, সেখানে দেশের মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ভেজাল’। চাল, ডাল, লবণ থেকে শুরু করে ফলমূল, মাছ-মাংস এমনকি শিশুদের গুঁড়ো দুধ- কোনো কিছুই এখন আর বিষমুক্ত নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার লোভে প্রতিটি গ্রাসেই ঢুকছে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু, যা তিলে তিলে ধ্বংস করছে জনস্বাস্থ্য।
ভয়ংকর চিত্র: ৩৩ শতাংশ খাবারে বিষের উপস্থিতি
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বিএসটিআই-এর সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৫৮৬টি অর্থাৎ প্রায় ৩৩.৪ শতাংশ খাবারই ভেজাল বা দূষিত।
পরীক্ষাগারে এসব খাবারে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো নিষিদ্ধ কেমিক্যাল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শিশুদের প্রিয় চিপসের ৬৫ শতাংশ নমুনায় মিলেছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ‘অ্যাক্রিলামাইড’। এছাড়া চালের নমুনায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম, হলুদের গুঁড়ায় সিসা এবং লবণ ও সরিষার তেলেও ক্ষতিকর মাত্রায় দূষণ ধরা পড়েছে।
ঝুঁকির মুখে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজালের প্রকোপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় এসব বিষাক্ত উপাদান দ্রুত শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল করে দিচ্ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা বলছে, শুধু ভেজাল খাদ্যের কারণে দেশে প্রতি বছর:
৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে।
২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কিডনি রোগে।
দেড় লাখ মানুষ নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে।
গর্ভবতী মায়েরা জন্ম দিচ্ছেন প্রায় ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশু।
অঙ্গ বিকল ও অকাল মৃত্যুর মিছিল
চিকিৎসায় স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলাম জানান, খাবারে ব্যবহৃত কৃত্রিম রঙ, প্রিজারভেটিভ ও ফরমালিন লিভার ও কিডনি অকেজো হওয়ার প্রধান কারণ। একইভাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, “খাদ্য যেখানে রোগ ঠেকানোর কথা, সেখানে ভেজাল খাবার হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্জি ও পাকস্থলীতে প্রদাহ তৈরি করছে।” অতীতে দিনাজপুরে লিচুর বিষক্রিয়ায় শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাও এ বিষাক্ত চক্রের ভয়াবহ উদাহরণ।
মাঠপর্যায়ে তদারকির সংকট
বিএফএসএ-র সদস্য ড. মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, নিয়মিত অভিযান চললেও জনবল সংকট একটি বড় বাধা। প্রতিটি জেলায় মাত্র ৩ জন কর্মী দিয়ে তদারকি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এছাড়া নিজস্ব ল্যাব না থাকায় সরকারি অন্যান্য পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা প্রক্রিয়াটিকে কিছুটা ধীর করে দেয়।
বিপাকে সাধারণ মানুষ
রাজধানীর বাসিন্দা মো. আসলামের আক্ষেপ, “বাইরে খেলে ভেজাল খেতে হবে জেনেও আমাদের উপায় নেই। বাজারে গিয়ে নির্ভেজাল পণ্য খুঁজে পাওয়া এখন যেন খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো।”
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে এই মহামারি ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর আইনের প্রয়োগ, ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা। ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস এবং ভেজাল চক্রের মূল উৎপাটনই এখন সময়ের দাবি।