সোমবার, ২২ Jun ২০২৬, ০২:২১ অপরাহ্ন
লালমনিরহাট প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
বাংলাদেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ এবং তিস্তা নদীর তীরবর্তী তীব্র ভাঙন পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন সরকারের তিন উচ্চপদস্থ মন্ত্রী। শুক্রবার (১৯ জুন) লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী এলাকায় অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প এলাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ হাই-প্রোফাইল সফর অনুষ্ঠিত হয়।
এই বিশেষ সফরে অংশ নেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই পরিদর্শনের পর স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মাঝে বহুল প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন এবং টেকসই নদীশাসন কার্যক্রমে নতুন গতি আসার জোরালো প্রত্যাশা ও আশার আলো তৈরি হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শনকালে মন্ত্রীরা প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা, সেচ কার্যক্রম, সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঘুরে দেখেন।
পরবর্তীতে ব্যারাজের অবসর হলরুমে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তারা। সভায় তিস্তা অববাহিকার নদীভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী নদীশাসন, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এ সময় তিস্তা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, সেচ ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বা বিস্তারিত দৃশ্যমান উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
প্রকৃতপক্ষে, তিস্তা ব্যারাজ শুধু একটি সাধারণ পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নয়; এটি সমগ্র উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে এক অভূতপূর্ব চালিকাশক্তি। একসময় খরা ও পানির তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত এই অঞ্চলে আজ তিস্তার সেচের পানি লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে সবুজের সমারোহ সৃষ্টি করেছে। ফলে এক ফসলি জমি বহু ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে এবং কৃষকদের জীবনযাত্রার মানেও এসেছে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন।
সফরের অংশ হিসেবে মন্ত্রীরা তিস্তা নদীর তীরবর্তী তীব্র ভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও নদীপাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের নদীভাঙন সমস্যা, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারানোর চরম দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে স্থায়ী নদীশাসনের জোর দাবি জানান। স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই সফরের মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে এবং নদীভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
উক্ত পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় মন্ত্রীবর্গের সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান এবং লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুল।
প্রশাসনিক ও কারিগরি কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. একেএম. শাহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা, নকশা ও গবেষণা) প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন, রংপুর জোনের প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. সরফরাজ বান্দা, তিস্তা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানসহ লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার জেলা প্রশাসক এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
মন্ত্রীদের এই গুরুত্বপূর্ণ সফর উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপ জন মিত্র নিশ্চিত করেছেন যে, মন্ত্রীদের সফরকে ঘিরে নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।
তিস্তা ব্যারাজ দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সফল সেচ প্রকল্প হিসেবে উত্তরাঞ্চলের কৃষি বিপ্লব, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপরিসীম অবদান রেখে চলেছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজ ও এর চারপাশের অববাহিকাকে শুধু একটি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শন ও আলোচনা সভা শেষে মন্ত্রীত্রয় তিস্তা সড়ক ও রেল সেতু পরিদর্শন করেন এবং পরবর্তীতে সেতুর নিচে আয়োজিত একটি জনসমাবেশে যোগ দেন।