রবিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০৩ অপরাহ্ন
জামালপুর প্রতিনিধি:: জামালপুরে বেসরকারি শাহীন জেনারেল হাসপাতালে সিজার শেষে রোগীর পেটের ভেতরে অপারেশনের সরঞ্জাম রেখেই সেলাই করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তার স্বজনা। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।
শুক্রবার (৩ ডিসেম্বর) রাতে শহরের বেসরকারি শাহীন জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে মালিক পক্ষের কাছে ভূক্তভোগী রোগী ও তার স্বজনরা এই অভিযোগ করেন।
জানা গেছে, দুই মাস আগে গত বছরের ৩ নভেম্বর রাতে ইসলামপুর উপজেলার পালোয়ান মিয়ার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (২১) সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোর জন্য জামালপুর পৌর শহরের আমলাপাড়া এলাকায় বেসরকারি শাহীন জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে ওই রাতেই সিজার করেন মেডিকেল অফিসার ডা. দিল আফরোজ নিশা। সিজারের পর হাসপাতালে তিন দিন ভর্তি থাকার পর রোগী ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এরপর অবস্থা খারাপ হলে একাধিকাবার শাহীন জেনারেল হাসপাতালে সেবা নিতে আসলেও রোগী সুমাইয়া আক্তার কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। উল্টো রোগীর স্বজনদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। পরবর্তীতে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে জানা যায় সিজারের সময় পেটের ভেতরে সুতা রেখেই সেলাই করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর রোগী ও তার স্বজনরা শাহীন জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে অভিযোগ করেন। কিন্তু বিষয়টি আমলে না নিয়ে অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবী করেন হাসপাতালের মালিক শহিদুল ইসলাম শাহীন।
ভূক্তভোগী রোগী সুমাইয়া আক্তার অভিযোগ করে বলেন, সিজারের সময় অপারেশন থিয়েটারে হাসপাতালের মালিক শহিদুল ইসলাম শাহীন নিজেই সেলাই করেছেন। হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় তিন দিনই ব্যাথা হয়েছে। হাসপাতালের মালিক শাহীন নিজেই ব্যাথার ইঞ্জেকশন দিয়েছেন। তিনদিন পর ছুটি দিলে চলে যাই, কিন্তু ব্যাথা কমে না। সিজারের ক্ষতস্থান শুকাতে দেরী হওয়ায় একাধিকবার হাসপাতালে আসি। সিজারের ১০ দিন পর সেলাই কাটাতে আসি তখনও ব্যাথা ছিলো। ব্যাথা ভালো হওয়ার জন্য ঔষধ খেতে হবে কিনা জানাতে চাইলে হাসপাতালের মালিক শাহীন বলেন ঔষধ খাওয়ার দরকার নেই। সেলাই কাটার ৪ থেকে ৫ দিন পর সিজারের ক্ষতস্থানে ফোড়া হয়ে পুঁজ বের হতে থাকে। পরে আবার হাসপাতালে আসলে হাসপাতালের মালিক শাহীন নিজেই ড্রেসিং করে দেন এবং আমার স্বামী ও আমার মাকে ডেকে এনে বলে কোথায় পুঁজ বের হয়? কোথাও তো পুঁজ বের হয় নি।
এছাড়াও তিনি আমার স্বামী ও আমার মায়ের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে অবস্থা আরও বেশী খারাপ হলে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসা নেয়ার পর কিছুটা উন্নতি হয়। তবে কয়েকদিন পর আবারও অন্যপাশে ফোড়া হয়ে পুঁজ বের হয়। এরপর আল্ট্রাসনোগ্রাম করে জানা যায় সিজারের সময় ভেতরে সুতা রেখেই তারা সেলাই করেছে এবং ক্ষতস্থানে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে। আমি এই ঘটনার বিচার চাই।
রোগীর স্বামী পালোয়ান মিয়া জানান, দুই মাস ধরে আমার স্ত্রী ক্ষত নিয়ে ভূগছে। আমার স্ত্রীকে সিজারের সময় পেটের ভেতর সুতা রেখে সেলাই করেছে। আমি আমার স্ত্রীর সুচিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।
রোগীর স্বজন কুসুম ইসলাম বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম করে রিপোর্ট গাইনী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল হোসেনকে দেখালে তিনি জানিয়েছেন সিজারের সময় রোগীর পেটে সুতা রেখেই সেলাই করা হয়েছে। এজন্য ইনফেকশন হয়েছে। পরে শাহীন জেনারেল হাসপাতালে অভিযোগ নিয়ে আসলে হাসপাতালের মালিক শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন তার কিছুই করার নেই, আপনারা নিজেদের মত চিকিৎসা করান।
শাহীন জেনারেল হাসপাতালের মালিক শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, অভিযোগটি মিথ্যা ও বানোয়াট। সিজারের পর সমস্যা নিয়ে আসলে তার স্বামীকে দেখানো হয়েছে যে কোন সমস্যা নেই। দুই মাস পর মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ নিয়ে এসেছে। তার আল্ট্রসনোগ্রামের রিপোর্ট স্বাভাবিক আছে। তারপরও তাকে গাইনী চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেছি।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জনাতে ডা. দিল আফরোজ নিশার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দিয়ে মুঠোফোনটি বন্ধ করে রাখেন। পরে কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার আগেই হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু হয়। আমি যখন হাসপাতালটি পরিদর্শন করি তখন দেখি প্রতিষ্ঠানটি চলার মত না। কিন্তু মুচলেকা নিয়ে হাসপাতালের মালিককে জানিয়ে দেই এক বছর পর ওই ভবনে হাসপাতাল চলতে পারবে না। এই হাসপাতালের সার্জন বা চিকিৎসক যারা আছে তাদের আমরা নজরে রাখি। তবে হাসপাতালের মালিক শহিদুল ইসলাম শাহীন অপারেশন থিয়েটারে কোন কাজ করতে পারবেন না। রোগী আমাদের অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।