শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৪ অপরাহ্ন

কঠিন হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষা: নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক॥
দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা ও মান ফেরাতে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা নজরদারি, প্রশ্নফাঁস রোধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং প্রয়োজনে বিতর্কিত ‘হেলিকপ্টার মিশন’ পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। আসন্ন ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা থেকেই এই নতুন নিয়মাবলী কার্যকর হবে।

নজরদারিতে সিসি ক্যামেরা ও লাইভ মনিটরিং
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হবে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সব কেন্দ্রে এটি বাধ্যতামূলক করা হবে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ‘লাইভ মনিটরিং’-এর মাধ্যমে কোনো অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত হলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিম।

‘হেলিকপ্টার মিশন’ ও আকস্মিক পরিদর্শন
২০০১-২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন ড. মিলনের আকস্মিক কেন্দ্র পরিদর্শন বা ‘হেলিকপ্টার মিশন’ নকল প্রতিরোধে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ১৯ বছর পর পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি আবারও সেই কঠোর তদারকির ইঙ্গিত দিয়েছেন। মন্ত্রী জানান, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তিনি বা তাঁর প্রতিনিধিরা দেশের যেকোনো প্রান্তে হেলিকপ্টার যোগে কেন্দ্রে হাজির হতে পারেন।

বাতিল হচ্ছে ভেন্যু কেন্দ্র, থাকছে না ‘গ্রেস মার্ক’
পরীক্ষায় তদারকি সহজ করতে এবার ২৯২টি ‘ভেন্যু কেন্দ্র’ (সহযোগী কেন্দ্র) বাতিল করা হয়েছে। শুধুমাত্র মূল কেন্দ্রগুলোতেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, অতি দুর্গম নিকলি ও অষ্টগ্রাম ছাড়া আর কোথাও ভেন্যু কেন্দ্র থাকছে না। এছাড়া খাতা মূল্যায়নে কোনো প্রকার ‘অতিরঞ্জিত নম্বর’ বা ‘গ্রেস মার্ক’ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। শিক্ষার্থীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হবে।

শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সতর্কবার্তা
অনিয়ম রোধে এবার শুধু পরীক্ষার্থী নয়, দায়িত্বরত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপরও খড়গহস্ত হচ্ছে মন্ত্রণালয়। কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজধানীর কেন্দ্রগুলোর জন্য গঠন করা হয়েছে বিশেষ টহল স্কোয়াড। এছাড়া কোনো স্কুলের শিক্ষক নিজ স্কুলের পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।

মাদরাসা ও কারিগরি কেন্দ্রে বিশেষ নজর
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সাধারণ স্কুলের তুলনায় মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নকলের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের যোগসাজশে নকলের যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা ভাঙতে এবার গোপনীয় বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ানো চক্রের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে।

সময় সাশ্রয় ও অভিন্ন প্রশ্নপত্র
শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে সময় বাঁচাতে প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করার পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা থেকে সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা কমানোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর হুঁশিয়ারি:
“আমরা আর কোনো ‘অটোপাস’ বা দয়া-দাক্ষিণ্যের সংস্কৃতি চাই না। মেধার প্রকৃত লড়াই হবে। কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম হলে শিক্ষার্থীসহ দায়িত্বরতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com