বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

ঈদযাত্রা মানেই যেন পথের ভোগান্তি

ঈদযাত্রা মানেই যেন পথের ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিনিধি  ঃ

ঈদযাত্রা মানেই যেন পথের ভোগান্তি। যদিও গত কয়েক দিন সব ধরনের যানবাহন মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করেছে। কিন্তু গতকাল বুধবার রেলপথ ও সড়কপথে যথেষ্ট দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন ঘরমুখী যাত্রীরা। তবে তাতে যেন ভ্রুক্ষেপ ছিল না কারোরই। দুর্ভোগ-ভোগান্তি যা-ই হোক, বাড়িতে তো যেতেই হবে। ঠিক সেই উদ্দীপনা আর স্বজনদের সঙ্গে ঈদ-আনন্দ ভাগাভাগি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় গতকাল বিপুলসংখ্যক মানুষ  রাজধানী ছেড়েছেন।

গতকাল রাজধানী ঢাকার তিনটি বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালে ছিল ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তার মাঝে সন্ধ্যার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে তীব্র বজ্রবৃষ্টি যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। গত কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে ঘরমুখী হতে দেখা যায়। এর মাঝে রাজশাহী-উত্তরাঞ্চলমুখী চন্দ্রা মোড় থেকে দীর্ঘ যানজটের খবর পাওয়া যায়। গাজীপুরের সড়কে থেমে থেমে চলছিল যানবাহন। অন্যদিকে বগুড়ার সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে কমলাপুর স্টেশনে আটকা পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও বিভিন্ন স্থানে ছিল মাঝারি থেকে তীব্র যানজট। সদরঘাটে ছিল লঞ্চযাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে দুই যাত্রী লঞ্চে উঠতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

পাশাপাশি গতকালও সড়কে অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্যের অভিযোগ পাওয়া যায়। বাস টার্মিনালগুলোতে সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠে। যদিও গতকাল সকালে রাজধানীর গাবতলী আন্তজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, কোথাও অনিয়মের প্রমাণ পেলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নগর পরিবহনের অধিকাংশ বাস-মিনিবাসে গাদাগাদি করে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালের দিকে ছুটছিলেন ঘরমুখী মানুষ। এ কারণে রাজধানীর প্রধান সড়কে বিকেল থেকে যানজটের সৃষ্টি হয়।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর কমলাপুরে ঢাকা রেলস্টেশনে ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন ছেড়ে গেলেও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না প্ল্যাটফর্ম কিংবা বগিতে। ট্রেনের ভেতর জায়গা না পেয়ে অনেককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদে চড়তেও দেখা গেছে। অন্যদিকে ঈদযাত্রার আনন্দ ও বাড়ি ফেরার তাড়ায় স্টেশনে ছিল তপ্ত পরিবেশ। হাতে টিকিট থাকা সত্ত্বেও ভিড় ঠেলে নিজের আসনে বসতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে অনেক যাত্রীকে। প্রায় প্রতিটি ট্রেন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওনা হয়।

গতকাল ভোর থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কোনো ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। তবে দৃশ্যপট বদলে যায় দুপুর আড়াইটার দিকে। বগুড়ার সান্তাহার জংশনের কাছে ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হলে ট্রেনযাত্রীদের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

রেলের সময়সূচি অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৫টায় চিলাহাটি এক্সপ্রেস, রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে দ্রুতযান এক্সপ্রেস, রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে লালমনি এক্সপ্রেস, রাত সাড়ে ১১টায় পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নীলসাগর এক্সপ্রেস সান্তাহারে লাইনচ্যুতির ঘটনায় এই ট্রেনগুলো আটকে পড়ে কমলাপুরে। ট্রেনের এই শিডিউল বিপর্যয়ের পর উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের কেউ কেউ বিপাকে পড়ে বিকল্প উপায়ে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেন।

দিনাজপুরের যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘ট্রেন ছাড়তে দেরি হবে দেখে আমি গাবতলীর কয়েকটি বাস কাউন্টারে যোগাযোগ করেছিলাম। বাসের টিকিট পেলাম না। বউ-বাচ্চা নিয়ে বিপাকে পড়েছি। বাড়ি যেতে হবে। উপায় নেই তাই কমলাপুরে বসে আছি।’

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ায় পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও পার্বতীপুরের সঙ্গে ঢাকা, রাজশাহী এবং খুলনার ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। চিলাহাটিগামী রূপসা এক্সপ্রেস রানীনগর স্টেশনে আটকে পড়ে। পঞ্চগড় অভিমুখী একতা এক্সপ্রেস ও চিলাহাটি অভিমুখী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস আব্দুলপুর জংশনে আটকা পড়ে।

চট্টগ্রাম রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদারের সঙ্গে কথা বলে আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, গতকাল বুধবার সকালে বিজয় এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম পৌঁছাতে দেরি করায় ফিরতি ট্রিপে ২ ঘণ্টা দেরি হয়। এ ছাড়া অন্য ট্রেনগুলো যথা সময়ে চট্টগ্রাম স্টেশন ছেড়ে গেছে। চাঁদপুর রুটে একজোড়া বিশেষ ট্রেন ছেড়েছে বেশ যাত্রী নিয়ে।

রেলের পূর্বাঞ্চল অফিস জানিয়েছে, যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন ট্রেনে ১০৫টি বগি সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি অতিরিক্ত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে এবারের ঈদযাত্রায়।

গতকাল ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে। তবে গতকাল মহাখালীতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়েও টিকিট না পাওয়া, গাবতলীতে বাড়তি ভাড়া আদায় এবং সায়েদাবাদে যানজটের কারণে অনেকের ঈদযাত্রার আনন্দ ম্লান হয়েছে।

গতকাল মহাখালীতে দেখা যায়, ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। সামনেই বাস দাঁড়িয়ে থাকলেও টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকার অভিযোগ করেন অপেক্ষমাণরা। তবে টিকিট-সংকটের কথা অস্বীকার করেন ইউনাইটেড কাউন্টারের মাস্টার তরিকুল ইসলাম রাজ। তার দাবি, পথে যানজটের কারণে বাস ফিরতে দেরি হওয়ায় কিছুটা সমন্বয় করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘টিকিট দেওয়া আমরা বন্ধ রাখিনি।’

অন্যদিকে গাবতলী টার্মিনালে ঘরমুখী মানুষের প্রধান অভিযোগ ছিল বাড়তি ভাড়া নিয়ে। রাজবাড়ীগামী যাত্রী মো. অন্তর অভিযোগ করেন, ‘নিয়মিত ৩৯০ টাকার ভাড়া আজ (বুধবার) ৭০০ টাকা রাখা হচ্ছে।’ একই অভিযোগ পাওয়া যায় মাগুরা ও পাংশাগামী বাসগুলোতেও।

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা অবশ্য বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ মানতে নারাজ। সাকুরা পরিবহনের ম্যানেজার মো. আল আমিন বলেন, ‘সারা বছর আমরা সরকারি চার্টের চেয়ে ১০০-২০০ টাকা কম রাখি। এখন নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করায় যাত্রীদের কাছে তা বাড়তি মনে হচ্ছে।’

বিআরটিএর ভিজিল্যান্স টিমের সহকারী পরিচালক মইনুল হাসান জানান, টার্মিনালের ভেতর চার্ট অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। টার্মিনালের বাইরে অনিয়ম ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন।

সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় দক্ষিণবঙ্গ ও সিলেটগামী যাত্রীদের তীব্র ভিড় দেখা গেছে। নামি পরিবহনগুলোর আগাম টিকিট আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন শেষ মুহূর্তের যাত্রীরা। লোকাল বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে এখানেও।

সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘হাজারের বেশি গাড়ি ঢাকা ছেড়েছে। ভাড়া বেশি নিলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

চট্টগ্রামগামী যাত্রী মো. শাহজাহান তাকে জানান, চট্টগ্রামগামী বিভিন্ন পরিবহনের টিকিটে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়তি আদায় করা হয়েছে। যদিও কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) বিষ্ণুপদ শর্মা এ বিষয়ে বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আমাদের কাছে কেউ করেননি।’

গতকাল রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে যান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সামনে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ঈদুল ফিতর সামনে রেখে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা যাত্রী হয়রানি করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সবাই নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছে। বরং দু-একটি পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০-৩০ টাকা কম নিচ্ছে, যা যাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। পুলিশ কন্ট্রোল রুম আমাদের জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় অভিযোগ পাওয়া যায়নি।’

রাজধানীর লোকাল বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হচ্ছে। গতকালও নবীনগর ও বাইপাইলে বাড়তি ভাড়া নেওয়ায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঈদের পর নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে অবৈধ কাউন্টারগুলোর বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। মালিকদের প্রতি অনুরোধ, নির্ধারিত স্থানের বাইরে কোথাও যেন কাউন্টার না খোলা হয়।’

এ সময় ঈদযাত্রায় জ্বালানিসংকট নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ১৫ মার্চ রাত ১১টা থেকে গণপরিবহনে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে কোথাও কোনো ঘাটতি নেই।

রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে গতকাল সড়কপথে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ রওনা দেন। এ সময়ে দিনভর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বিকেলের পর সড়কপথের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

এর মাঝ্যে গতকাল বিকেলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও চন্দ্রা-নবীনগর সড়কে ২১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট দেখা দিয়েছিল। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। সন্ধ্যার পর থেকে এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ আরও অনেকাংশে বেড়ে যায়।

হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল বিকেলে গাজীপুরের কয়েক শ শিল্পকারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। ফলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কারখানাকর্মী ঘরমুখী হলে যানবাহন ও সড়কে ব্যাপক চাপ পড়ে। তবে এবারের ঈদযাত্রায় বড় শঙ্কা থাকলেও গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তেমন বড় ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি যাত্রীদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com