মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৪ অপরাহ্ন

সিজারের পর কোমরব্যথা: অ্যানেস্থেসিয়াই কি দায়ী?

সিজারের পর কোমরব্যথা: অ্যানেস্থেসিয়াই কি দায়ী?

প্রচলিত ধারণা বনাম চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা, সচেতন হোক প্রতিটি মা

ডা. সৈয়দা সুমাইয়া বুশরা:

“সিজার করলে কোমরব্যথা হবেই”, “কোমরে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার কারণেই সারাজীবন কোমরব্যথা থাকবে”—আমাদের সমাজে এমন ধারণা এখনও প্রচলিত। এসব কথা শুনে অনেক গর্ভবতী মা সিজারিয়ান অপারেশনের আগে স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়া নিয়ে অযথা ভয় ও উদ্বেগে ভোগেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিজারিয়ান অপারেশনের পর কোমরব্যথা হলেই তার জন্য স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়াকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। দীর্ঘমেয়াদি কোমরব্যথার সঙ্গে স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

গর্ভাবস্থাতেই শুরু হতে পারে কোমরব্যথা

গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে উল্লেখযোগ্য শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। গর্ভের শিশুর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ওজন ও ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং কোমর ও পিঠের পেশি, জয়েন্ট ও লিগামেন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। হরমোনগত পরিবর্তনও এসব কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে গর্ভাবস্থায় শুরু হওয়া কোমরব্যথা সন্তান জন্মের পরও কিছু সময় থাকতে পারে।

সন্তান জন্মের পর শিশুকে বারবার কোলে নেওয়া, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় ভুল ভঙ্গিতে বসা, দীর্ঘসময় ঝুঁকে থাকা, একই ভঙ্গিতে বসে বা শুয়ে থাকা এবং দৈনন্দিন কাজের শারীরিক চাপ—এসব কারণেও কোমরব্যথা হতে বা বেড়ে যেতে পারে।

স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়া সম্পর্কে বাস্তবতা কী?

স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়ায় কোমরের নিচের অংশে একটি সূক্ষ্ম সূঁচের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগ করে অপারেশনের সময় ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সিজারিয়ান অপারেশনে এটি বহুল ব্যবহৃত একটি অ্যানেস্থেসিয়া পদ্ধতি।

অ্যানেস্থেসিয়ার পর ইনজেকশনের স্থানে সাময়িক ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। তবে সঠিক কৌশলে দেওয়া স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়াকে দীর্ঘমেয়াদি কোমরব্যথার একমাত্র কারণ হিসেবে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তাই সিজারের পর কোমরব্যথা দেখা দিলে শুধু অ্যানেস্থেসিয়াকে দায়ী না করে অন্যান্য সম্ভাব্য কারণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সিজারিয়ান অপারেশনে অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশনের আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা, পূর্বের রোগের ইতিহাস, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করে উপযুক্ত অ্যানেস্থেসিয়া পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়।

অপারেশনের সময় অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক মায়ের রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক বিষয় পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করেন।

তাই নিরাপদ অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে দক্ষ সার্জনের পাশাপাশি যোগ্য ও প্রশিক্ষিত অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে সিজারের পর কোমরব্যথা হলে কী করবেন?

প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোমরব্যথার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। গর্ভাবস্থার শারীরিক পরিবর্তন, প্রসব-পরবর্তী শারীরিক চাপ, শিশুকে কোলে নেওয়া, ভুল ভঙ্গিতে বসা কিংবা আগে থেকেই থাকা কোমরের সমস্যাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় সঠিক ভঙ্গিতে বসা, শিশুকে কোলে নেওয়ার সময় কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া, দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে না থাকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসা উপকারী হতে পারে।

তবে ব্যথা যদি তীব্র হয়, ক্রমশ বাড়তে থাকে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, পায়ে অবশভাব বা দুর্বলতা দেখা দেয়, হাঁটাচলায় সমস্যা হয় অথবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

🩺 সচেতন মায়ের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা

✓ সিজারের পর কোমরব্যথা হলেই অ্যানেস্থেসিয়াকে দায়ী করা ঠিক নয়।

✓ গর্ভাবস্থার শারীরিক ও হরমোনগত পরিবর্তন কোমরব্যথার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

✓ শিশুকে কোলে নেওয়া ও বুকের দুধ খাওয়ানোর ভুল ভঙ্গি কোমরব্যথা বাড়াতে পারে।

✓ স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়ার পর সাময়িক স্থানীয় অস্বস্তি হতে পারে, তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি কোমরব্যথার একমাত্র কারণ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।

✓ যোগ্য ও প্রশিক্ষিত অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান নিরাপদ অস্ত্রোপচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

✓ অস্বাভাবিক, তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী কোমরব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শেষ কথা

সিজারিয়ান অপারেশন ও অ্যানেস্থেসিয়া নিয়ে ভয় বা লোকমুখে প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

একজন দক্ষ সার্জনের পাশাপাশি যোগ্য ও প্রশিক্ষিত অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান মায়ের নিরাপদ অস্ত্রোপচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। ভুল ধারণা নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্যই হোক আমাদের ভরসা। সচেতন মা, নিরাপদ মা।

 

 লেখক, এমবিবিএস, বিসিএস, ডিএ
মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র
খুলনা সদর, খুলনা

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com