বুধবার, ২৯ Jul ২০২৬, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: সাম্প্রতিক গবেষণায় ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এমনকি বাতাস, পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। টুথপেস্ট, প্রসাধনী, বোতলজাত পানি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পর এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যপণ্য সয়াবিন তেলেও মিলেছে উদ্বেগজনক মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা প্রতি লিটারে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা তেলে দূষণের মাত্রা আরও বেশি পাওয়া গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ সম্প্রতি গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে সয়াবিন তেলের ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে, যা বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২৪ গুণ বেশি। তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলের নমুনায় দূষণের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ।
গবেষকদের মতে, শিল্পকারখানার আধিক্য, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল কারখানার নিকটবর্তী অবস্থান এবং খোলা তেল সংরক্ষণে একই পাত্র বারবার ব্যবহারের কারণে এই দূষণ বাড়ছে।
ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে তেলের নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হলো- লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি), পলিইউরেথেন (পিইউ) ও নাইলন। গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি বিশ্বে এই প্রথম কোনো গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিক কণার ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ফাইবার বা আঁশজাতীয়। এর মধ্যে ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ স্বচ্ছ এবং ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ কণার আকার ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে।
দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। তারা প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে। একটি শিশু তার জীবনকালে প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শরীরে গ্রহণ করতে পারে বলে গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, প্রজননক্ষমতা হ্রাস এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে সরাসরি রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে সক্ষম।
গবেষণা দলের প্রধান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে একটি উদীয়মান দূষক, যা মানবদেহের প্রজননতন্ত্র ও বিপাকীয় ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। প্লাস্টিক পুরোপুরি বর্জন করা এখনই সম্ভব নয়। তাই প্লাস্টিক বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার এবং খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।”
গবেষকরা খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি, মানসম্মত ফিল্টার ব্যবহার এবং খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি দেশে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
ভোজ্যতেলের আগে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। শিশুদের জন্য তৈরি কয়েকটি টুথপেস্টেও এই দূষক পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বের সমুদ্রে প্রায় ৫১ ট্রিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক ভাসছে। প্লাস্টিক বর্জ্য সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। সামুদ্রিক অণুজীব থেকে শুরু করে মাছ এবং খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে এসব কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এছাড়া টি-ব্যাগ, বোতলজাত পানি, সিনথেটিক কাপড়, প্রসাধনী এবং প্লাস্টিক মোড়কে সংরক্ষিত খাদ্য থেকেও নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মানুষের শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক হরমোনের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, ক্ষতিকর অণুজীবের বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক হুমকি। তাই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।