মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন

লাল শাপলায় রঙিন জামালপুরের বৈলডাঙ্গা বিল, কিন্তু সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে অবহেলায়

বিশেষ প্রতিনিধি, জামালপুর ॥
ভোরের সূর্য ওঠার আগেই শান্ত জলে পাপড়ি মেলে হাসছে জলজ ফুলের রানী-শাপলা। ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়ে ফুটতে শুরু করা এই শাপলার লাল গালিচায় ঢেকে গেছে জামালপুরের ইসলামপুরের বৈলডাঙ্গা বিল। ঝিরিঝিরি বাতাসে লাল শাপলার দোলা, স্বচ্ছ টলমল পানি, আর তাতে মাছরাঙা ও সাদা বকের আনাগোনায় বিলে যেন রূপকথা নেমে এসেছে। তবে প্রতিদিন মানুষের ভিড় আর অহেতুক ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার কারণে বিলের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখন হুমকির মুখে।

বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য:
ইসলামপুর পৌর এলাকার টংগের আগলা ও পাথর্শী ইউনিয়নের পূর্ব হাড়িয়াবাড়ী গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে একসময়ের খরস্রোতা বৈলডাঙ্গা বিল। যদিও কয়েক দশক আগে বিলের মাঝ দিয়ে সড়ক নির্মাণের ফলে এর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, তবুও হাড়িয়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের জলাশয়ে ফোটা লাল শাপলা ধরণীর বুকে লাল-সবুজের এক অপরূপ সমারোহ তৈরি করেছে। জামালপুরের বোয়ালমারিসহ আশপাশের অন্যান্য জলাশয়েও এখন ফুটে রয়েছে শাপলা।

দর্শনার্থীদের ভিড় ও ভালো লাগা:
প্রতিদিনই এই চোখ জুড়ানো রূপ দেখতে বিলে ভিড় করছেন শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ নানা বয়সী দর্শনার্থী। কেউ ঘুরছেন, কেউ শাপলা সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ সেলফি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন।

ঘুরতে আসা স্থানীয় শিক্ষিকা রোকেয়া আক্তার বলেন, “বিলের শাপলা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। শাপলা ও পাতা স্পর্শ করলে মনে হয় সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে এসেছি। এটি পুরো পরিবেশকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।” অপর দর্শনার্থী শামীম মিয়া জানান, এলাকায় বিনোদনের জায়গা না থাকায় প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে তিনি ছুটে এসেছেন।

ফুল ছেঁড়ায় বাড়ছে উদ্বেগ:
সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে অনেক দর্শনার্থী ছবি তোলার জন্য বা বাসায় প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার নামে ইচ্ছেমতো শাপলা ছিঁড়ে নিচ্ছেন। ফলে বিলে দিন দিন শাপলার সংখ্যা কমে আসছে এবং বিনষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

ঐতিহ্য, পুষ্টি ও ওষুধি গুণ:
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সিরাজ উদ্দিন জানান, এক দশক আগেও এই অঞ্চলে গোলাপি, সাদা, বেগুনি, নীল ও বিরল প্রজাতির হলুদ শাপলা ফুটত। গ্রামীণ ও শহরের মানুষের কাছে শাপলা কেবল জাতীয় ফুল বা সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি একটি জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর সবজিও।

পুষ্টি ও ওষুধি গুণ: শাপলায় প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে। বিশেষ করে লাল শাপলার ভেষজ ও ওষুধি গুণ অনন্য, যা চুলকানি ও আমাশয় রোগে বেশ উপকারী।

খাদ্য হিসেবে ব্যবহার: শাপলার ফল অর্থাৎ ‘ড্যাপ’ শিশুদের অত্যন্ত প্রিয়। গ্রামবাংলায় ড্যাপের খই ভেজে মোয়াসহ নানাবিধ মুখরোচক খাবার তৈরি হয়। আগে অনেকেই শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সংকটে বিল ও বিলুপ্তির পথে বিরল শাপলা:
বর্তমানে লাল ও সাদা শাপলা কিছুটা দেখা গেলেও বিলুপ্ত হয়ে গেছে গোলাপি, বেগুনি, নীল ও হলুদ রঙের শাপলা। জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয়ের নাব্যতা হ্রাস, খাল-বিল ভরাট করে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং ফসলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এই মূল্যবান রূপ-রস ও প্রতীক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com