মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ন

রোহিঙ্গা গণহত্যার ৯ বছরেও শেষ হয়নি বেদনা, ফেরেনি ন্যায়বিচার

একুশের কণ্ঠ প্রতিবেদন:: ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ সামরিক অভিযান ও সহিংসতা শুরু হয়। প্রাণ বাঁচাতে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। দিনটি এখন রোহিঙ্গাদের কাছে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণ, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের বেদনা এবং ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতেও প্রতিবছর ২৫ আগস্ট শোক, স্মরণ ও অধিকার আদায়ের প্রত্যয় নিয়ে দিনটি পালন করেন রোহিঙ্গারা। তাদের কাছে এটি শুধু অতীতের ভয়াবহতার স্মরণ নয়; বরং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রত্যাশারও প্রতীক।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা একটি মুসলিম জাতিগত জনগোষ্ঠী। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার তারা। বিশেষ করে নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। এর ফলে রোহিঙ্গারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচল ও জীবিকার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের বিধিনিষেধের মুখোমুখি হয়।

তবে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মধ্যে বহু গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং নারী ও শিশুসহ অনেকেই বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। ধ্বংস করা হয় ঘরবাড়ি, ধর্মীয় স্থাপনা, বিদ্যালয় ও জীবিকার উৎস।

প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গল, পাহাড়, নদী ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ।

সীমিত সম্পদ ও বিপুল জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দিয়ে আসছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় খাদ্য, চিকিৎসা, পানি, স্যানিটেশন ও অন্যান্য মৌলিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের উদ্যোগে অনেক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে তদন্ত করছে।

তবে শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা জরুরি।

শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জীবনও নানা সংকটে জর্জরিত। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। ২০১৭ সালের সহিংসতার স্মৃতি ও স্বজন হারানোর বেদনা অনেকের জীবনেই গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে নাগরিকত্ব পুনর্বহাল, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জবাবদিহিতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা হলে তা টেকসই হবে না।

২৫ আগস্ট তাই শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয় দিন। জাতিগত বিদ্বেষ, বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, রোহিঙ্গা সংকট তারই একটি নির্মম উদাহরণ। এ দিনে নিহত ও নির্যাতনের শিকার মানুষদের স্মরণের পাশাপাশি নিরাপদ ভবিষ্যৎ, ন্যায়বিচার এবং নিজ ভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিও নতুন করে সামনে আসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com