রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৬ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টারঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হচ্ছে আজ-কালের মধ্যে। নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনে ভোট নিয়ে চলছে নানা হিসাবনিকাশ। ভোটের হিসাব মেলাতে নির্বাচনী জোট গড়তে চলছে নানা তৎপরতা। বড় দলগুলো নিজেদের জোটে টানতে ছোট দলগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
ইতিমধ্যে ভোটকেন্দ্রিক পাঁচটি দল সক্রিয় হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি রাজনৈতিক জোট এখনো সক্রিয় রয়েছে। এই জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন নিয়ে আলোচনা চলছে বিএনপি’র। এই জোটের বিপরীতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বে ৮ দলের জোট নির্বাচনী মাঠে তৎপরতা শুরু করেছে। এই জোটে আরও কয়েকটি ইসলামী দলকে যুক্ত করার চেষ্টা আছে।
সম্প্রতি এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনকে নিয়ে তিন দলের জোট গঠন করেছে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির একাংশ, জাতীয় পার্টি-জেপি’র নেতৃত্বে ১৮ দলের একটি জোটেরও ঘোষণা দেয়া হয়েছে সম্প্রতি। নভেম্বরের শেষদিকে বাম প্রগতিশীল ৯টি দলের সমন্বয়ে আরও একটি জোট গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই পাঁচ জোটের বাইরে থাকা দলগুলোও কোনো না কোনো জোটে অংশ নেয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে।
চলছে আসন নিয়ে দরকষাকষি। এনসিপি’র সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনা থাকলেও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে গণ-অধিকার পরিষদ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলটির একটি অংশ বিএনপি’র সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার পক্ষে। ৮ দলের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ রয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, নির্বাচনী জোট নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া মধ্যপন্থি নতুন জোটের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে। তফসিলের পর গণঅধিকার পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এখনো কোনো জোটে যায়নি। বিএনপি’র সঙ্গে কয়েকটি আসনে আগেই সমঝোতার আলোচনা ছিল। সম্প্রতি ৮ দলের সঙ্গেও জমিয়তের যোগাযোগ হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচন সামনে রেখে দুই দফায় ২৭২ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। বাকি ২৮টি আসনের ১২ থেকে ১৫টি আসনে মিত্র দলের নেতাদের প্রার্থী করার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়েছে বিএনপি। চারটিতে সীমানা জটিলতার কারণে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। অন্য আসনগুলোতে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে জটিলতা রয়েছে। এই আসনগুলোতে সমমনাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে আজ থেকে আলোচনা শুরু হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সমঝোতা হয়ে যাবে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
যদিও সমমনা দলগুলোর নেতারা আরও বেশি আসন চাইছেন। কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন। বিএনপি’র তরফে আগেই বলা হয়েছে সমমনাদের নিয়ে নির্বাচন এবং ভোটে জয়ী হলে তাদের সঙ্গে নিয়েই সরকার গঠন করা হবে। আসন সমঝোতার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মানবজমিনকে বলেন, দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন নিয়ে কাজ চলছে। বিএনপি’র সঙ্গেও আলোচনা হবে। আজ ১২ দলের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে আসন নিয়ে সমমনাদের সঙ্গে বিএনপি’র আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে আজ বা আগামী কালই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ওদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দল আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ‘ওয়ান বক্স পলিসিতে’ আসন সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমঝোতার ভিত্তিতে জোটের পক্ষ থেকে এক আসনে একজন প্রার্থী দেয়া হবে এই জোটের পক্ষ থেকে। গতকাল থেকেই এই জোটের প্রার্থী বাছাইয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করেন নেতারা। বৈঠক শেষে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, এক আসনে আট দলের মনোনীত একজন প্রার্থী থাকবেন। তারা হবেন দেশপ্রেমী এবং ইসলামী ঐক্যের প্রার্থী। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রচার কর্মসূচি চলমান থাকবে।
জামায়াতের লিয়োজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আজাদ জানিয়েছেন, জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা সমঝোতার ভিত্তিতে এক আসনে এক প্রার্থী দেয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারবেন এবং ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জোটের সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ দেড়শ’র মতো আসনে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে এটি পরিবেশ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এই জোটের অন্য দলগুলো হলো জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি, ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। জামায়াত ইতিমধ্যে তিনশ’ আসনেই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে প্রচার চালাচ্ছে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ১৩০ আসনের প্রার্থী তালিকা দিয়েছেন। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৫০ আসনে প্রার্থী তালিকা দিয়েছে। অন্য দলগুলোও কিছু আসনে নিজেদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
সর্বশেষ সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি- জেপির নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামে একটি জোটের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। রাজধানীর গুলশানের ইমানুয়েলস পার্টি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে ১৮ দলের সমন্বয়ে নতুন জোটের ঘোষণা দেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
জোটভুক্ত অন্য দলগুলো হলো জনতা পার্টি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, জাতীয় ইসলামিক মহাজোট, জাতীয় সংস্কার জোট, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, স্বাধীন পার্টি, জাতীয় স্বাধীনতা পার্টি, বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি, বাংলাদেশ সর্বজনীন দল, বাংলাদেশ জনকল্যাণ পার্টি, অ্যাপ্লায়েড ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয় লীগ। এনডিএফ জোটের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। প্রধান সমন্বয়ক হয়েছেন জনতা পার্টি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার মিলন এবং প্রধান মুখপাত্র রুহুল আমিন হাওলাদার।
বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া জাতীয় পার্টি এবার নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে চ্যালেঞ্জ এবং সংশয় রয়েছে। এ ছাড়া দলের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের কারণে আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে বহিষ্কার করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। এই নেতারাই একজোট হয়ে আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন এবং নির্বাচনে অংশ নেয়ার উদ্যোগ নেন। এই জোটের নেতারা মনে করছেন বিএনপি’র বিপরীতে ভোটারদের একটি অংশ তাদের পক্ষে থাকবেন।
এর আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একদফার ঘোষক ও এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন জোটের ঘোষণা দেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা হাসনাত কাইয়ূম। নতুন এ জোটের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করবেন নাহিদ ইসলাম। তিন দল নিয়ে এই জোট হলেও সামনে এতে আরও দল যুক্ত হতে পারে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
গত ২৯শে নভেম্বর বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ৯টি দল নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে বৃহত্তর জোট গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। নতুন এই জোটটি একসঙ্গে আন্দোলন ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা জানিয়েছে। এই ফ্রন্টে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ছয় শরিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও বাসদ (মার্কসবাদী) রয়েছে। শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ এবং প্রয়াত নেতা পংকজ ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ন্যাপ নতুন জোটে যুক্ত হয়েছে। এই বাম জোট স্বতন্ত্র নির্বাচন করবে নাকি শেষতক অন্য কোনো জোটে যুক্ত হবে এটি এখনো পরিষ্কার নয়।