রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৫ অপরাহ্ন

ড্রয়ারে চিরকুট লিখে বাড়ি ছাড়া ছেলে আজ মাইক্রোসফটে

ড্রয়ারে চিরকুট লিখে বাড়ি ছাড়া ছেলে আজ মাইক্রোসফটে

হোসাইন মোহাম্মদ সাগরঃ

সেদিন ভোরবেলার কথা নাসিমের এখনো মনে আছে। স্কুলব্যাগের ভেতরে পছন্দের গল্পের বই, কয়েকটা জামাকাপড়, আর বুকভরা অদম্য এক জেদ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বের হওয়ার আগে ছেলেটা ড্রয়ারের ভেতরে একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিল। হাতের লেখায় মাত্র একটি লাইন “মানুষের মতো মানুষ হয়েই তবে আমি বাড়ি ফিরব।”

ক্লাস এইটে পড়া সেই কিশোর তখন জানত না, এই একটা লাইনই একদিন তার পুরো জীবনের দিকনির্দেশনা হয়ে উঠবে। সে জানত না যে রেললাইনের উপর দিয়ে পায়ে ফোসকা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যে স্বপ্ন সেদিন সে দেখেছিল, সেই স্বপ্নই একদিন তাকে নিয়ে যাবে জাপানে মাইক্রোসফটের ডেটা সেন্টারে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা-সদরপুরের ছেলে মো. নাসিম আল আওয়াল। পাড়া-প্রতিবেশী, ছোটবেলার বন্ধুরা তাকে ‘কবি’ বলেই ডাকে। সেই নামের পেছনে হয়তো একটা কারণ আছে, ছোটবেলা থেকেই তার ভেতরে ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি, জীবনকে অন্যভাবে দেখার চোখ।

বাবা মো. রবি ছিলেন পাবনার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশ ভালো পদে। জীবন ছিল আড়ম্বরপূর্ণ। কিন্তু ঘুষের সঙ্গে আপস করতে রাজি না হওয়ায় ১৯৯৬ সালে সেই সোনার চাকরি ছেড়ে দিলেন। ফিরে এলেন গ্রামে। তারপর মুদির দোকান, মাঠের কাজ কোনোটাই ঠিকমতো দাঁড়ায়নি। শেষে ২০০৩ সালে দলিল লেখকের পেশা ধরলেন। সংসারে টানাটানি লেগেই থাকত। তবে সেই কঠিন জীবনই নাসিমকে দিয়েছিল তার জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা অবস্থান নয়, আদর্শই আসল সম্পদ। বাবাকে দেখে বড় হওয়া নাসিম কখনো সেই শিক্ষা ভোলেননি।

ছোটবেলা থেকেই দুরন্তপনা আর চঞ্চলতাকে সাথে করে পাখির বাসা খুঁজে বেড়ানো, পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, গরু-ছাগলের জন্য মাঠ থেকে ঘাস কাটা একটা অজপাড়াগাঁয়ের ছেলের সব রং ছিল তার। তবে ভেতরে ভেতরে একটা আলাদা কৌতূহল সবসময় টগবগ করত। এলাকার যে কোনো মোবাইল, টিভি বা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস নষ্ট হলে সবাই আসত নাসিমের কাছে। সে সারিয়ে দিত। কীভাবে শিখেছে কেউ জিজ্ঞেস করলে নিজেও ঠিক বলতে পারত না। শুধু জানত, এই জিনিসগুলো বোঝার মধ্যে একটা আনন্দ আছে।

নবম শ্রেণিতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগে জীব বিজ্ঞানের পরিবর্তে সাবজেক্ট হিসেবে নিলেন কম্পিউটার শিক্ষা। সে সময় ডিনেটের ‘কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রাম’-এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন। স্কুল শুরুর আগে ভোরবেলা ক্লাস। মাঠের ভেতরের শর্টকাট পথে কুয়াশা ঠেলে আসতে হতো প্রতিদিন। পাট ক্ষেতের আইলে ঝড়-বৃষ্টির বাধা, তবু থামেননি। সেটাই ছিল তার প্রথম কম্পিউটার ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা।

কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে পড়তে গিয়ে আরও গভীর হলো সেই ভালোবাসা। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য একটা ডিভাইসও ছিল না। তখন মা মোছা. নাজমা সংসারের একটি ছাগল বিক্রি করে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিলেন। মায়ের সেই ত্যাগের কথা মনে পড়লে আজও নাসিমের গলা ধরে আসে। সেই ফোনকেই মডেম বানিয়ে অনলাইনে ঢুকতেন, ভিডিও দেখে শিখতেন, আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রশ্ন করতেন। পুরো একটা জগৎ খুলে যাচ্ছিল তার সামনে।

এরপর একসময় জাপানে যাওয়ার সুযোগ এল। ভিসা হলো, কিন্তু টাকা নেই। আত্মীয়দের কাছে সাহায্যের জন্য বললে অনেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। শেষে ব্যাংক ঋণ আর খুবই কাছের কিছু মানুষদের সহযোগিতা যাত্রা শুরু হলো। জাপানে গিয়ে প্রথম কাজ পেলেন নাগোয়ার একটি গাড়ি কারখানায় প্রোডাকশন লাইনে। রোবোটিক সিস্টেমের পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির যন্ত্রাংশ বানানো। সেই এক বছর চার মাস ছিল জীবনের অন্যতম কঠিন সময়। তবে নাসিম বলেন, “ওই সময়টা আমাকে শিখিয়েছে- টিকে থাকা মানে শুধু সাহস নয়, ধৈর্যও।”

২০২০ সালে, করোনার ঢেউয়ের মাঝে, ঘঞঞ ঈড়সসঁহরপধঃরড়হং-এ যোগ দিলেন নেটওয়ার্ক অপারেশনস সেন্টার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। সাবমেরিন কেবলের সিগন্যাল মনিটরিং থেকে কাস্টমার সাপোর্ট- দীর্ঘ পাঁচ বছর আট মাস নিজেকে ক্রমাগত ছাড়িয়ে গেছেন। পাশাপাশি ৪০টিরও বেশি অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করেছেন। ঞঙঊওঈ-এ পেয়েছেন ৮৭৫। জাপানি ভাষায় ঘ৪ পাস করেছেন- কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই, শুধু শুনে শুনে, দেখে দেখে।

আর চাকরির আবেদন? অসধুড়হ, এড়ড়মষব, অঢ়ঢ়ষব, ঙৎধপষব, ওইগ- একের পর এক প্রত্যাখ্যান এসেছে। ২০২২ সালে মাইক্রোসফটেও চেষ্টা করেছিলেন, হয়নি। কিন্তু প্রতিটি ‘না’ তাকে থামায়নি, বরং প্রতিটি ব্যর্থতার পর তিনি বসে ভেবেছেন- এবার কোথায় ঘাটতি, এবার কী শেখা দরকার।

অবশেষে সেই দরজা খুলল। বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউয়ে দুর্দান্তভাবে মন জয় করে নিলেন ইন্টারভিউয়ারদের। গরপৎড়ংড়ভঃ ঔধঢ়ধহ-এর ঈঙ+ও টিমে- যে দল অুঁৎব, গরপৎড়ংড়ভঃ ৩৬৫, ঢনড়ী-এর পুরো ক্লাউড অবকাঠামো তৈরি, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে- সেখানে জায়গা হলো কুষ্টিয়ার সেই ‘কবি’র।

নাসিম বলেন, “আমি কখনো অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু হাল ছাড়িনি। প্রতিটা প্রত্যাখ্যানকে আমি শেষ মনে করিনি মনে করেছি একটা নতুন প্রশ্ন, যার উত্তর আমাকে খুঁজে বের করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের তরুণদের মেধার কোনো অভাব নেই। শুধু দরকার ধারাবাহিকতা আর নিজের উপর বিশ্বাস।

ডিগ্রি একটা কাগজ, দক্ষতাই আসল পরিচয়।” ভবিষ্যতে দেশের তরুণদের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আছে তার। নিজের গল্পটা বলতে চান- যাতে অন্য কেউ কোনো প্রত্যাখ্যানকে শেষ ভেবে বসে না থাকে। ড্রয়ারে লেখা সেই চিরকুটের কথা কি এখনো মনে পড়ে? হয়তো পড়ে। তবে এবার আর শুধু বাড়িতে ফেরার প্রতিজ্ঞা নয়- পুরো একটা প্রজন্মকে পথ দেখানোর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন কুষ্টিয়ার সেই ‘কবি’।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com