শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রামে ছিনতাইকারী চক্রের সম্রাট শাহাবুদ্দিন কে থামাবে ?

চট্টগ্রাম মহানগরীতে দিন-রাত কোথাও না কোথাও ঘটছে ছিনতাই। নগরবাসী আতঙ্কে, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীরা আতঙ্কে, রাতের যাত্রী—আরও বেশি।

মুহাম্মদ এরশাদ, চট্টগ্রাম থেকেঃ চট্টগ্রাম মহানগরীতে দিন-রাত কোথাও না কোথাও ঘটছে ছিনতাই। নগরবাসী আতঙ্কে, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীরা আতঙ্কে, রাতের যাত্রী—আরও বেশি। ছিনতাইকারীদের হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র, ধারালো চাকু, হেঁসো, চুরি, এমনকি পিস্তল পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। আর এই ভয়ঙ্কর ছিনতাই-সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের শীর্ষে রয়েছে একদল দুর্ধর্ষ গ্রুপ যার গডফাদার হিসেবে পরিচিত শাহাবুদ্দিন।

কোথায় তার অবস্থান, কারা তার শক্তি, কীভাবে পুলিশের চোখের সামনে ছিনতাই হয়, কেন তাকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না এসব প্রশ্ন আজ ভুক্তভোগীদের হৃদয়ে জ্বলন্ত ক্ষতের মতো।

গোপন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর এক চিত্র। শাহাবুদ্দিনের অধীনে রয়েছে দু’শর মতো সক্রিয় ছিনতাইকারী, তার নিকটাত্মীয়ও রয়েছে প্রায় ১৫–২০ জন, যারা সরাসরি তার নির্দেশনায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দাপট দেখিয়ে বেড়ায়।

তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয় একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে
✔ এলাকাভিত্তিক টিম
✔ অস্ত্র বহনকারী দল
✔ নজরদারি দল
✔ মোটরসাইকেল ও সিএনজি-ভিত্তিক ছিনতাইকারী স্কোয়াড
✔ ‘ব্যাকআপ’ দল, যারা হামলার সময় সহায়তা দেয়

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতে নয় এখন দিনের আলোতেও ছিনতাইকারীরা হামলা করতে ভয় পায় না। কয়েক মাস আগে ঘটে এক নজিরবিহীন ঘটনা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন চিকিৎসাধীন আসামিকে ছিনিয়ে নিতে আসে শাহাবুদ্দিনের লোকজন। পুলিশের ওপর ছুরি হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর এভাবে হামলা চালাতে পারে এটি শুধু দুঃসাহস নয়, বরং তাদের শক্তির উৎস কত গভীরে প্রোথিত তা প্রমাণ করে।

চট্টগ্রাম বন্দর থানার কাস্টম মোড়ে ঘটে আরেক ভয়াবহ ঘটনা। চলন্ত বাসে উঠেই যাত্রীদের মোবাইল ছিনতাইয়ের সময় ছিনতাইকারীরা এক যাত্রীকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনা নগরীতে ভয় ছড়ায়—কেউ আর গণপরিবহনেও নিরাপদ ছিল না।

২৭ নভেম্বর, রাত ২টা ৩০ মিনিট কোতোয়ালি থানাধীন জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে ব্যবসায়ী ও পথচারী ইসমাইল হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে সর্বস্ব লুটে নেয় ছিনতাইকারীরা। পরের দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। একজন সাধারণ নাগরিক, একজন ব্যবসায়ী শুধু ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারালেন। এ ঘটনায় নগরবাসীর ক্ষোভ সীমা ছাড়িয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সক্রিয় ছিনতাইকারী জানায় “শাহাবুদ্দিনের নামে ২৫–৩০টি মামলা আছে। কিন্তু সে ধরা পড়ে না। পুলিশের কিছু অসৎ কর্মকর্তা তার কাছ থেকে টাকা নেন। মাসোয়ারা দেয়ার কারণে তার এলাকায় ছিনতাই হলেও পুলিশ কিছু করে না।”

আরও জানায় “অনেক সময় পুলিশের সামনেই ছিনতাই হয়। যারা মাসোয়ারা পায়, তারা দেখেও না দেখার ভান করে।” এই অভিযোগ শুধু তার নয় স্থানীয় অনেকের সূত্রেও এমন তথ্য উঠে এসেছে।

শাহাবুদ্দিনের ছায়াতলে রয়েছে চট্টগ্রামের নানা এলাকার কয়েক ডজনের বেশি দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী। তাদের মধ্যে পরিচিত নামগুলো হলো আলী, বাপ্পি, টিটু, রুবেল, ইমন, আশরাফুল, তারেক, আল-আমিন, রহমান, সাইফুল, আবছার, মিশরী বেলাল, জাহেদ, পিচ্চি রুবেল, শাহীন, বশির এবং আরও অনেকে। এই দলগুলো নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, মার্কেট এলাকা, হাসপাতাল এলাকা, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন এবং রাতের নির্জন রাস্তায় হানা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ছিনতাইকারীদের দাপট সবচেয়ে বেশি কোতোয়ালি, নিউমার্কেট–লালদিঘি–আন্দরকিল্লা, বন্দর থানার কাস্টম মোড়, টাইগারপাস, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও হালিশহর এলাকার গলিপথ, জিইসি–টুয়েলভার মোড়–শোলাশহর, চকবাজারকাতালগঞ্জ মেইন রোড। দিনের বেলা পকেটমারি, রাতে ছিনতাই এই দুই চক্রের সংযোগও রয়েছে বলে অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কিছু অসৎ রাজনৈতিক নেতার ছায়া এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে এই চক্র। যারা টাকা নেন—তারা অভিযান এড়িয়ে যান। যারা নেন না তাদের সক্ষমতা কম, কারণ চক্রটি অস্ত্রসজ্জিত।

একজন ধরা পড়লেও নেটওয়ার্ক বন্ধ হয় না। কারণ
✔ এলাকায় ‘স্পট লিডার’ থাকে
✔ প্রতিটি এলাকায় আলাদা ‘ফিল্ড টিম’

সাধারণ মানুষের কথা
“মোবাইল হাতে নিয়ে হাঁটতে ভয় লাগে।”
“মহিলা ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।”
“পুলিশ যদি রাস্তায় থাকে—তবু ভরসা পাওয়া যায় না।”
নগরীর নিরাপত্তা যেন অদৃশ্য কারও কাছে জিম্মি।

চট্টগ্রামবাসীর একটাই দাবি শাহাবুদ্দিন ও তার পুরো নেটওয়ার্ককে ভেঙে না দিলে এই দুঃশাসন বন্ধ হবে না। প্রয়োজন
1. বিশেষ কম্বিং অপারেশন
2. ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টাস্কফোর্স
3. থানাভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি
4. ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি ও চেকপোস্ট
5. দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

চট্টগ্রামের মানুষ ক্লান্ত। প্রতিদিনের ছিনতাই, খুন, ছুরিকাঘাত—এ যেন জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাহাবুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি তার নেটওয়ার্ক নিয়ে নগরীর অর্ধেক এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে। প্রশ্ন একটাই “চট্টগ্রামে ছিনতাইকারী চক্রের সম্রাট শাহাবুদ্দিনকে কে থামাবে?” নগরবাসী এখন সেই উত্তরই খুঁজছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com