রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
ঢাকা: ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতের ষষ্ঠ মাসে এসে খোদ মার্কিন মিত্রদের গভীর সংশয় ও চরম অসন্তোষের মুখে পড়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি, সামরিক প্রস্তুতি এবং বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন। সম্প্রতি মার্কিন দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল মায়াদিন জানিয়েছে, বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও সেটিকে স্থায়ী রাজনৈতিক বা কৌশলগত ফলাফলে রূপ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক দুর্বলতাকেই বিশ্বমঞ্চে উন্মোচন করে দিয়েছে।
লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ ট্রাম্প প্রশাসন, সংকটে মার্কিন ঘাঁটি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে কড়া সমর্থনের ওপর ভর করে তেহরান আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। ইরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে সমুদ্রপথে- কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সংঘাতের সার্বিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই মারাত্মক কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং এই ব্যর্থতার জন্য দুই পক্ষই এখন একে অপরকে দোষারোপ করছে।
বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে ধস, বাড়ছে মার্কিন সেনা হতাহত
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের মুখে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক সফল হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন, যা পেন্টাগনের নিরাপত্তাবলয়কে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাল ওয়াশিংটন
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনঘন সিদ্ধান্ত ও উদ্দেশ্য পরিবর্তনের কারণে ওয়াশিংটন তার দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক আস্থাশীলতা হারিয়ে ফেলছে। এই যুদ্ধের জটিল গতিপ্রকৃতি বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অপ্রত্যাশিত, অস্থির ও বিশৃঙ্খল পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
লন্ডনের খ্যাতনামা নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান (থিঙ্ক ট্যাংক) চ্যাথাম হাউসের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেট পরিস্থিতির ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করে বলেন,
“এই যুদ্ধ হয়তো আরও দীর্ঘায়িত হবে; তবে এ পর্যন্ত যতটুকু ঘটেছে, তার ফলাফলকে ওয়াশিংটনের জন্য এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং কৌশলগত পরাজয় ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। মার্কিন মিত্রদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে- বর্তমান ওয়াশিংটনকে আর নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায় না।”
এই সংকটের কারণে ভবিষ্যতে নিজেদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার কথা ভেবে এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প হিসেবে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের তৎপরতা শুরু করেছে।
‘প্যাট্রিয়ট’ সংকটে পেন্টাগন: সুযোগ নিচ্ছে রাশিয়া ও চীন
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে বর্তমানে ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এয়ার-ডিফেন্স ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতির কারণে ইউক্রেনের মতো ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহ করাও ওয়াশিংটনের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ফলে দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো সামরিক সংঘাত সামলানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে- তা রাশিয়া ও চীনের মতো বৈশ্বিক মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।