সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৭ অপরাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি॥ শারীরিক তিন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অদম্য শিক্ষা যুদ্ধ। ভাল ফলাফলে দুইচোখ ভরা উচ্ছাস তাদের মধ্যে। উচ্চ শিক্ষার শেষ চুড়ায় পোঁছাতে চায় ওরা সবাই। তাই শত বাধা পেরিয়ে এবার এইচএসসি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন লালমনিরহাটের শারীরিক তিন প্রতিবন্ধী জান্নাতুল ফেরদৌসী ও হাসিনা আক্তার এবং রুবেল মিয়া।
জান্নাতুল ফেরদৌসীরঃ জন্মের পর থেকে দুই হাতের কোন আঙ্গুল নেই জান্নাতুল ফেরদৌসীর। এরপরেও থেমে নেই জিবন যুদ্ধ। প্রাথমিকের ৫ম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়ে মাধ্যমিকে ভর্তি হয়। জেএসসিতে জিপিএ-৫ আর এসএসসিতে ৪.৮৯ পেয়ে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন জান্নাতুল। সে এবার হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন কলেজের মানবিক শাখার শিক্ষার্থী হিসেবে হাতীবান্ধা মহিলা ডিগ্রী কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এইচএসসি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন এই অদম্য মেধাবী শারীরিক প্রতিবন্ধি।
শনিবার ইংরেজি ২য়পত্র পরীক্ষায় ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দুই হাতের আঙ্গুল না থাকলেও তালুর সাহায্যে আর দশজন পরীক্ষার্থীর মতই দ্রুত লিখে যাচ্ছে জান্নাতুল। তার লেখাও অসম্ভব সুন্দর। এমন লেখায় কক্ষ পরিদর্শকরাও খুশি। জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, ‘শত বাঁধা পেরিয়ে আজ এইসএসসি জয়ের চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে বিএসএস (শিক্ষা ক্যাডার) জয় করে শিক্ষকতা করতে চাই।” সে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের মধ্য গড্ডিমারী গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বুলুর মেয়ে।
হাসিনা আক্তারঃ লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দইখাওয়া গ্রামের দিনমজুর শাহেদ আলীর মেয়ে হাসিনা আক্তার মাত্র তিন বছর বয়সে টাইফয়েট জ্বরে দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে। তবে পড়ালেখার অদম্য বাসনায় ভর্তি হয় লালমনিরহাট জেলা সদরের হাড়িভাঙা এলাকায় বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস পরিচালিত একটি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কেন্দ্রে। সেখান থেকে লালমনিরহাট চার্চ অব গড স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে জেএসসি ও এসএসসি জয় করে হাসিনা। এবছর হাতীবান্ধা মহিলা কলেজের মানবিক শাখার শিক্ষার্থী হিসেবে স্থানীয় আলিমুদ্দিন কলেজ কেন্দ্রে শ্রুতি লেখকের সাহায্যে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে হাসিনা।
হাসিনা আক্তার জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো গান গাইতেও পারেন তিনি। পরিবারের অভাব অনটনের কারণে তার কলেজে পড়া প্রায় বন্ধ হতে চলেছিল। তাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে টাকা উপার্জন করে আবারও পড়াশোনা চালিয়ে আসছেন হাসিনা আক্তার। চোখের দৃষ্টি শক্তি না থাকায় দশম শ্রেণী পড়ুয়া সুলতানা তার কাছে শুনে এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র লিখছে। তাতে করে ফলাফল ভালো হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে অভিষ্যতে পড়ালেখার খরচ চালাতে পারবে কিনা? এমন শংকা কাটছে না হাসিনা আক্তারের। হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন কলেজের কেন্দ্র সচিব ও অধ্যক্ষ সরওয়ার হায়াত খান বলেন, ‘দুই হাতে আঙুল না থাকলেও জান্নাতুল খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। কেন্দ্রে দুই প্রতিবন্ধী এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করবে বলে বিশ্বাস করি।
রুবেল মিয়াঃ ছোট্ট বেলা আগুনে পুড়ে দু‘হাতের প্রায় সব আঙ্গুল হারাতে হয় রুবেল মিয়াকে। বাকি যে দু‘একটি আঙ্গুল অবশিষ্ট রয়েছে, সেটিও আবার বাকা। তাই লিখতে কষ্ট হলেও পড়ালেখায় পিছিয়ে নেই এই অদম্য মেধাবী। সে এবছর লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা উত্তরবাংলা ডিগ্রী কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে এইচএসসি পাশের স্বপ্ন আকঁছেন। তার বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার সুকানদিঘী এলাকায়। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, সেই ছোট বেলার আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ হাত দিয়ে আর দশজন শিক্ষার্থীর মতই এইচএসসির উত্তরপত্র লিখছেন রুবেল। ওই কেন্দ্রের দায়িত্বরত কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাশেদুল ইসলাম বলেন, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে আমি কিছুক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি রুবেলের হাতের লেখা অত্যান্ত চমৎকার। পরীক্ষাও বেশ ভালো দিচ্ছে।
রুবেল মিয়া জানায়, আমার দুই হাতের আঙ্গুল পুড়ে যাওয়ায় লিখতে বেশ সমস্যা হয়। এরপরেও পুড়ে যাওয়া হাতে লিখে এই পর্যন্ত এসেছি। আশা করি এইচএসসিও পাশ করবো ইনশাআল্লাহ। এভাবে পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে সরকারি চাকুরী করতে চায় রুবেল। রুবেলের মা মরিয়ম বেগম জানান, ১২ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সুকানদিঘী বাজারে ছোট একটি লন্ডির দোকান দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের লেখাপড়ার খরচ চালান রুবেল। কাকিনা উত্তরবাংলা ডিগ্রী কলেজের উপাধ্যক্ষ মাহফুজুল ইসলাম বলেন, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও অন্যদের চেয়ে বেশ মেধাবী রুবেল। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।