সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ন

বিপ্লব ও বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই

বিপ্লব ও বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই

খন্দকার আলী আব্বাস ॥ রাজনীতি যখন ছিল মানুষের মুক্তির অঙ্গীকার

মোঃ আলম হোসেন, সম্পাদক একুশের কণ্ঠ ॥
রাজনীতির সবচেয়ে বড় দেউলিয়াত্ব তখনই প্রকাশ পায়, যখন রাজনীতি মানুষের জন্য না হয়ে ক্ষমতার জন্য হয়ে ওঠে। যখন আদর্শের জায়গা দখল করে পদ-পদবি, নীতির জায়গা নেয় সুবিধাবাদ, আর জনগণের অধিকার চাপা পড়ে ব্যক্তিস্বার্থের কোলাহলে। তখন ইতিহাস ফিরে তাকায় তার প্রকৃত রাজনৈতিক মানুষদেও দিকে। ১৭ আগস্ট তাই শুধু একটি মৃত্যু বার্ষিকীর তারিখ নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক বিবেককে প্রশ্ন করার একটি দিন। এই দিনে স্মরণ করছি কৃষক-শ্রমিক ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের অকুতোভয় সংগঠক, কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা, নবাবগঞ্জের কৃতী সন্তান এবং আমার রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু খন্দকার আলী আব্বাসকে। তাঁর চলে যাওয়ার ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সময় যতই গড়িয়েছে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও সংগ্রামের প্রাসঙ্গিকতা যেন ততই গভীর হয়েছে।

প্রশ্ন একটাই বিপ্লবীর কি মৃত্যু হয়? না। মৃত্যু কেবল শরীরের। যে মানুষ নিজের জীবনকে মানুষের অধিকার, ন্যায়, সাম্য ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উৎসর্গ করেন, তাঁকে কবর দেওয়া যায়; তাঁর দেহ মাটিতে মিশে যায়; কিন্তু তাঁর আদর্শকে কবর দেওয়া যায় না। খন্দকার আলী আব্বাস ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর কাছে রাজনীতি কোনো পেশা ছিল না, ছিল দায়বদ্ধতা। রাজনীতি ছিল না নিজের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার; ছিল মানুষের ভাগ্য বদলের সংগ্রাম। কৃষকের ঘামে তিনি দেশের শক্তি দেখেছেন, শ্রমিকের শ্রমে দেখেছেন উৎপাদনের ভিত্তি, আর বঞ্চিত মানুষের চোখে দেখেছেন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রকৃত চেহারা। আজকের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর রাজনীতির পার্থক্য এখানেই।

আজ রাজনীতিতে অনেকের কাছে প্রশ্ন ‘আমি কী পেলাম?’ খন্দকার আলী আব্বাসের রাজনীতির প্রশ্ন ছিল ‘মানুষ কী পেল?’ আজ কেউ কেউ রাজনীতিকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার হিসেবে। আজ অনেকে পদ হারানোর ভয়ে সত্য বলতে দ্বিধা করেন। তিনি সত্য বলার জন্য পদ-পদবি, সুবিধা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থকে কখনো বড় করে দেখেননি। এ কারণেই তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক আদর্শের নাম।

আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তাঁর সান্নিধ্য ও শিক্ষা আমার জন্য ছিল এক অনন্য প্রাপ্তি। তিনি শিখিয়েছেন, অন্যায়কে অন্যায় বলতে হয়, সে অন্যায় যার বিরুদ্ধেই হোক। শিখিয়েছেন জনগণের পাশে দাঁড়ানোর। রাজনীতিতে ভয়, লোভ কিংবা ব্যক্তিগত হিসাবের কোনো স্থান নেই। সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল মানুষের জন্য রাজনীতি করতে হলে মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করতে হয়। আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাঁর সেই শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন।

কারণ আমরা এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে স্লোগান আছে, কিন্তু অনেক সময় স্লোগানের সঙ্গে মানুষের জীবনের বাস্তবতার মিল নেই। দল আছে, পতাকা আছে, মিছিল আছে, বক্তৃতা আছে, কিন্তু কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, বেকারের কর্মসংস্থান, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা, এসব মৌলিক প্রশ্ন কতটা রাজনীতির কেন্দ্রে আছে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খন্দকার আলী আব্বাসের জীবন আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমাদের বলে জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

মানুষের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে কোনো উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। আর আদর্শ বিসর্জন দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা ইতিহাসে কখনো মহৎ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরি করে না। তাঁর রাজনীতি ছিল সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁর সংগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষই ইতিহাসের মূল শক্তি।

আজ তাঁকে স্মরণ করার অর্থ তাই শুধু তাঁর ছবিতে ফুল দেওয়া নয়। শুধু স্মরণসভা, আলোচনা কিংবা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাঞ্জলিও নয়। তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় অর্থ হলো তাঁর আদর্শের সামনে নিজেদের দাঁড় করানো।

আমরা কি মানুষের পাশে আছি? আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছি? আমরা কি ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছি? আমরা কি রাজনীতিকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারছি? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে খন্দকার আলী আব্বাসকে স্মরণ করার মধ্যেও কোথাও না কোথাও আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে যায়। তিনি হয়তো আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের জন্য এক রাজনৈতিক আয়না। সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখা সহজ নয়। কারণ সেখানে শুধু অর্জন দেখা যায় না; দেখা যায় ব্যর্থতা, আপস, সুবিধাবাদ এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুতির চিহ্নও।

শত বছরেও হয়তো আরেকজন খন্দকার আলী আব্বাস জন্ম নেবেন না। কারণ এমন মানুষ কেবল একটি পরিবারে জন্ম নেন না; তাঁরা জন্ম নেন একটি সময়ের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক দায় থেকে। তাঁদের তৈরি করে সংগ্রাম, ত্যাগ, আদর্শ এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আজ তাঁর মৃত্যু বার্ষিকীতে সবচেয়ে বড় শপথ হতে পারে রাজনীতিকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনার শপথ। ক্ষমতার কাছে নয়, জনগণের কাছে জবাবদিহির রাজনীতি প্রতিষ্ঠার শপথ। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার শপথ। কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকারের প্রশ্নে নীরব না থাকার শপথ। কারণ একজন বিপ্লবীকে সত্যিকার অর্থে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তাঁর অনুসারীদের।

খন্দকার আলী আব্বাসের মৃত্যু হয়েছে ১৫ বছর আগে; কিন্তু তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয়নি। তাঁর শরীর নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা আছে। তাঁর কণ্ঠ নেই, কিন্তু তাঁর বক্তব্য আছে। তাঁর পদচারণা নেই, কিন্তু তাঁর দেখানো পথ আছে। তাঁর হাত নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রামের পতাকা এখনও বহন করার মানুষ আছে।

গুরুজি, আপনাকে ভুলিনি। ভুলবও না। আপনি আমাকে শিখিয়েছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় রাজনীতি নেই, সত্য বলার চেয়ে বড় সাহস নেই, আর আদর্শের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। আপনি চলে গেছেন, কিন্তু আপনার রাজনৈতিক শিক্ষা আমাদের বিবেকের ভেতর বেঁচে আছে। আপনার সংগ্রাম বেঁচে আছে। আপনার স্বপ্ন বেঁচে আছে। আর যতদিন কৃষক তার অধিকার চাইবে, শ্রমিক ন্যায্য মজুরির দাবি তুলবে, শোষিত মানুষ ন্যায়ের জন্য দাঁড়াবে, ততদিন খন্দকার আলী আব্বাসের মতো বিপ্লবীদের মৃত্যু হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com