মঙ্গলবার, ০২ Jun ২০২৬, ০১:০৭ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা ॥
লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা নিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এক উত্তপ্ত ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে সরাসরি ‘উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডের কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবাই তাকে ঘৃণা করছে এবং ইসরায়েলও আন্তর্জাতিকভাবে চরম সমালোচনার মুখে পড়ছে।
‘আমি না থাকলে তুমি কারাগারে থাকতে’
সূত্রমতে, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে এক বিপজ্জনক স্তরে নিয়ে গেছে, যা ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে বলেন, “তুমি উন্মাদ হয়ে গেছ। আমি না থাকলে তুমি কারাগারে থাকতে। আমি তোমাকে রক্ষা করছি। অথচ এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। তোমার কারণে ইসরায়েলকেও ঘৃণা করছে সবাই।” এক পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করেন, “তুমি আসলে কী করছ?”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে- তা ট্রাম্প স্বীকার করেন। তবে তার মতে, নেতানিয়াহু বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি উসকে দিচ্ছেন।
বৈরুত ধ্বংসের পরিকল্পনায় ট্রাম্পের আপত্তি
প্রতিবেদনে প্রকাশ, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের একটি বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান ট্রাম্প। তার আশঙ্কা ছিল, রাজধানীতে এমন বড় কোনো আগ্রাসন চালানো হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এছাড়া, মাত্র একজন হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে হত্যার উদ্দেশ্যে পুরো একটি বহুতল ভবন ধ্বংস করার ইসরায়েলি পরিকল্পনাতেও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
এই ফোনালাপের পরই অবশ্য সুর নরম করতে বাধ্য হয় তেল আবিব। একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, বৈরুতে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে এসেছে ইসরায়েল।
ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের বার্তা ও হিজবুল্লাহর সম্মতি
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি নিয়ে একটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বৈরুতে বড় অভিযান না চালানোর জন্য তিনি নেতানিয়াহুকে অনুরোধ করেছিলেন এবং নেতানিয়াহু তার সেনাদের পিছু হটার নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের জন্য তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদও জানান।
একই বার্তায় ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার কথা হয়েছে এবং তারা ইসরায়েল ও ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েলও হামলা থামাবে। তবে এই যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্প নিজেও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন।
নেতানিয়াহুর ভিন্ন সুর
এদিকে ফোনালাপের বিষয়টি স্বীকার করলেও ট্রাম্পের বক্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তবে বৈরুতে আঘাত হানতে ইসরায়েল দ্বিধা করবে না। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত অভিযান যথারীতি চলবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা
গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে দুই পক্ষ একটি যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনা ইরানের সঙ্গে চলমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য বড় বাধা হতে পারে। কারণ তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো সম্ভাব্য বৈশ্বিক সমঝোতার ক্ষেত্রে লেবাননের পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
রুবিওর প্রস্তাবে হিজবুল্লাহর সম্মতি
উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই লেবানন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দেওয়া একটি সমঝোতা প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে হিজবুল্লাহ। ওই প্রস্তাবের মূল শর্ত অনুযায়ী- ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে আর কোনো হামলা চালাবে না, এবং এর বিনিময়ে হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলে সব ধরনের রকেট ও সামরিক হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।