শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি॥ লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শ্রীখাতা (সোনামারি)-খোদরপাড়া সড়কটি পাকাকরণে নিম্নমানের ও ব্যবহার অযোগ্য ইটের খোয়া ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে এলজিইডির পক্ষ থেকে সেগুলো অপসারণ করে মানসম্পন্ন ইটের খোয়া ব্যবহারের জন্য দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হলেও কোনো ভাবেই তা মানছেন না সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। সড়ক পাকাকরণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় স্থানীয় জনগনের একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে অভিযোগের সত্যতা পার। এতেও শেষ নয়, ব্যবহৃত খোয়ার নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষার মাধ্যমেও প্রমাণিত হয় নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ। ফলে সেসব সরিয়ে সিডিউল অনুযায়ী মানসম্পন্ন খোয়া ব্যবহারের জন্য তাগাদা দেওয়া হলেও কর্ণপাত করেননি ঠিকাদার। উল্টো এতকিছুর পরেও তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ ব্যবহৃত খোয়া সমান করতে রোলার ব্যবহারের পর তিনি এখন সেখানে পানি ছিটাচ্ছেন ইটের ‘রং’ ফিরিয়ে আনতে। অপরদিকে কাজটি তদারকিতে প্রকৌশলীর বদলে এলজিইডির একজন সার্ভেয়ারকে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যার কোনো ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেই। আইনুল হক নামের ওই সার্ভেয়ারের সাথেই মূলত যোগসাজশ করে ইচ্ছেমতো সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র মতে, স্থানীয় জনগনের অভিযোগের পরপরই সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে লালমনিরহাটে সদ্য যোগদানকারী নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম আমিরুজ্জামান অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন। ফলে সে ঘটনা উল্লেখসহ চতুর্থ দফায় কালীগঞ্জের উপজেলা প্রকৌশলী গত মঙ্গলবার আরোও একটি চিঠি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান টুম্পা ট্রেডিং এর সত্বাধিকারী আব্দুল হাকিমকে পাঠিয়েছেন। চিঠিতে একই বিষয়ে তিনটি চিঠি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয় ‘‘সড়কের কাজ বাস্তবায়ন কালীন সময়ে সরেজমিন পরিদর্শনে ‘সবিস্তার বিবরণী’ বর্হিভূত নিম্নমানের ইটের খোয়া অপসারণে লিখিতভাবে বলা সত্বেও তা অপসারণ না করে আপনি কাজ চলমান রেখেছেন। গত ১৫ অক্টোবর নির্বাহী প্রকৌশলীও বিষয়টি পরিলক্ষিত হন এবং তিনি মানসম্পন্ন সামগ্রী মজুদসহ অফিসের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করার কথা বলা সত্বেও তা উপেক্ষা করে আপনি কাজ চলমান রেখেছেন’। এদিকে অভিযোগ ওঠার পর গত ১৭ অক্টোবর লালমনিরহাট এলজিইডির ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান আব্দুর রাজ্জাক নির্মানাধীন সড়কটি থেকে ডাব্লিউবিএমে ব্যবহৃত খোয়ার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষাতেও নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের সত্যতা মিলেছে বলে জানা গেছে।
খোদরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল গনি বলেন, গত সপ্তাহে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীর সরেজমিন পরিদর্শনের পরেও ডাব্লিউবিএমে ব্যবহার করা খোয়া সমতল করতে রোলার দিয়ে সমান করা হয়েছে। আর এরপর থেকে প্রতিদিনই ওইসব নিম্নমানের খোয়ার রং ফিরিয়ে আনতে সেখানে দিনব্যাপী পানি ছিটানো হচ্ছে। আমরা এই এলাকার হাজার হাজার লোক ওই রাস্তার উপর দিয়ে চলাচল করবো। সেই রাস্তার কাজ যদি ঠিকাদার অবৈধ ভাবে দু নম্বর সামগী দিয়ে তৈরী করে, সেটা আমরা কোনদিন হতে দেব না। তাই ঠিকাদার যেন স্টিমেট অনুযায়ী এক নম্বও সামগ্রী দিয়ে রাস্তার কাজ করেন এজন্য আমরা এলাকার সচেতন লোকজন এলজিইডি প্রকৌশলী বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছি।
এলজিইডি সূত্র মতে, যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ তদারকিতে এলজিইডির অন্তত একজন উপসহকারী প্রকৌশলী সংযুক্ত করার কথা। কিন্তু ওই সড়কের জন্য কালীগঞ্জ থেকে সম্প্রতি বদলি হয়ে যাওয়া উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান সংযুক্ত করেছেন সেখানে কর্মরত সার্ভেয়ার আইনুল হক নামে একজনকে। জানা গেছে, কোনো সার্ভেয়ার তদারকির দায়িত্ব তখনই পাবেন, যখন তিনি ডিপ্লোমা ডিগ্রীধারী হবেন। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার কোনো ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট নেই।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা লালমনিরহাটের জ্যেষ্ঠ্য সহকারী প্রকৌশলী মাসুদার রহমান ঠিকাদারকে একাধিক চিঠি দেওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘চিঠিগুলোতে নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণের কথা স্পষ্ট লিখিত আকারে বলা হয়েছে। আর সেটা যদি ঠিকাদার না মানেন তাহলে তিনি তার কাজের বিল পাবেন না, বন্ধ হয়ে যাবে এবং তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’। এ বিষয়ে কথা বলতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সত্বাধিকারী আব্দুল হাকিমের সাথে (০১৭১১-৮০৭৮৮১) মোবাইলে কথা বলতে চাইলে তাকে পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২’ এর আওতায় সড়কটি নির্মাণে কার্যাদেশ পায় জেলার আদিতমারীর ঠিকাদার আব্দুল হাকিম। তবে আব্দুল হাকিমের লাইসেন্সে কাজটি কালীগঞ্জের ইটভাটা ব্যবসায়ী আতাউর রহমাম ওরফে মাঝি করছেন বলে জানা গেছে। আতাউরের কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করেছে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। মূলত তার ভাটার গত বছরের ব্যবহার অযোগ্য অবিক্রিত ইটের খোয়া-রাবিশ দিয়ে তিনি কাজটি করেছেন।
লালমনিরহাটে সদ্য যোগদানকারী নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম আমিরুজ্জামান বলেন, স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সেই রাস্তার কাজ দেখার জন্য সেখানে যাই এবং কাজের দুর্নীতির সত্যতা পাই। কিন্তু এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বার বার লিখিত ভাবে স্টিমেট অনুযায়ী কাজ করার জন্য বলা হলেও তিনি তা মানছেন না। এজন্য তিনি ওই কাজের বিল বন্ধসহ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান।