শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০০ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ

মধ্যপ্রাচ্যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি: সামরিক শক্তিতে এগিয়েও কেন ইরানের কাছে ‘অসহায়’ ট্রাম্প?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা ॥
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র আর অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক কৌশল- এই দুইয়ের লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত রণক্ষেত্র। তবে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে যোজন যোজন এগিয়ে থেকেও কেন তেহরানকে দমনে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন? মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই যুদ্ধের নেপথ্যের জটিল সমীকরণ।

হরমুজ প্রণালি: ইরানের তুরুপের তাস যুদ্ধের শুরুতেই ইরান বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ব তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নিছক যুদ্ধ নয়, বরং ‘প্রভাব বিস্তারের’ খেলা। ইরানের কৌশলগত এই চাল ওয়াশিংটনকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে। সিএনএন বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে শক্তি থাকলেও নিশ্চিত জয়ের জন্য তাকে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে হবে, তা তিনি নিতে চাচ্ছেন না।

ব্যর্থ হচ্ছে ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাল? সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছেন, ট্রাম্পের কূটনীতির কারণে ইরান ২০টি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। যুদ্ধের আগে এই রুট দিয়ে দৈনিক ১০০-এর বেশি জাহাজ চলত। সেই তুলনায় ২০টি জাহাজ সমুদ্রের বিশাল জলরাশিতে বিন্দুবৎ। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যাকে ‘সাফল্য’ বলছে, বাস্তবে তা সংকটের সামান্য সমাধান মাত্র।

সামরিক অভিযানের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে পারে। কিন্তু সেখানে মার্কিন নৌবাহিনী অবস্থান নিলে ইরান যদি একটি জাহাজও ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়, তবে তা হবে তেহরানের জন্য বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। এছাড়া ইরানের মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযানের অর্থ হলো হাজার হাজার মার্কিন সেনার মৃত্যুঝুঁকি, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে ধসিয়ে দিতে পারে।

খার্গ দ্বীপ ও মিত্রদের শঙ্কা পারস্য উপসাগরের খার্গ দ্বীপ বা ইরানের তেল শোধনাগারগুলোতে হামলার হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প। কিন্তু এ ধরনের হামলায় ইরান দমে না গিয়ে বরং আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো (যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরব) এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে শঙ্কিত। তাদের পর্যটন ও বাণিজ্য খাত এরই মধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমনকি ইরানের পাল্টা হামলায় যদি ওই অঞ্চলের লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্টগুলো (পানির প্রধান উৎস) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নও তুলবে।

অর্থনৈতিক কার্ড ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তেলের রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাপের মুখে, যা দেশটিতে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। তবে তেলের বিশ্ববাজার স্থিতিশীল রাখতে ট্রাম্প নিজেই মাঝে মাঝে ইরানি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। হোয়াইট হাউস যে ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে, তার অনেকগুলোই ইরানের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, যা তেহরান কখনোই মেনে নেবে না।

উপসংহার: কার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে? ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমারের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উত্তেজনা প্রশমনের নয়, বরং আরও জটিল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান তাদের সীমিত শক্তিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত হয়তো ট্রাম্পকে এমন এক চুক্তিতে সই করতে হবে, যা তাকে শক্তিশালী নয় বরং সমঝোতাকারী হিসেবেই উপস্থাপন করবে।

সময় দুই পক্ষের জন্যই সীমিত। ইরান যেমন নিষেধাজ্ঞার চাপে পিষ্ট, ট্রাম্পের ধৈর্যও তেমনি শেষ পর্যায়ে। এই লিভারেজ বা প্রভাব বিস্তারের খেলায় শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।

সূত্র: সিএনএন ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com