মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪০ অপরাহ্ন

বাসররাতে মুখ ধোয়ার পর কনেকে চিনতে না পারার অভিযোগ, বিয়ে গড়াল আদালতে

মোঃ বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:: বিয়ের আয়োজন, নতুন জীবনের স্বপ্ন সবই চলছিল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু বাসররাতে কনে মুখ ধোয়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। বর দাবি করেন, যাকে বিয়ের আগে দেখানো হয়েছিল, বাসরঘরে বসে থাকা নববধূ সেই নারী নন, তিনি অন্য কেউ। এই অভিযোগ ঘিরেই বিয়ের আনন্দ রূপ নেয় সন্দেহ, উত্তেজনা ও মামলার জটিলতায়।

কনে বদল’-এর এই ঘটনা এখন ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকায় ঘটনার পর বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত, শেষে কারাগারেও যেতে হয় বরকে।

গত বছরের ১ আগস্ট রাণীশংকৈলের ভান্ডার এলাকার জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের সঙ্গে একই জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের বিয়ে হয়। বিয়ের রাতেই বর ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে ‘কনে বদল’-এর অভিযোগ তোলা হয়।

ঘটনাটি মীমাংসার জন্য একাধিকবার দুই পক্ষ আলোচনায় বসলেও কোনো সমাধান হয়নি। পরে গত বছরের ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে একটি মামলা করেন। এর জবাবে ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করে পাল্টা মামলা দায়ের করেন।

উভয় পক্ষের মামলার প্রেক্ষিতে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বরের মামা বাদল সাংবাদিকদের জানান, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হানের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঘটক একটি মেয়েকে দেখান। পাত্র ও উপস্থিত স্বজনদের পছন্দ হলে বিষয়টি জানানো হয়। পরে মেয়ে পক্ষের লোকজন ছেলে পক্ষের বাড়িতে এসে নতুন করে মেয়ে না দেখিয়েই দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানায়।

তিনি বলেন, রায়হান কবিরের দুলাভাই মানিক মালয়েশিয়া প্রবাসী। দ্রুত বিদেশে ফিরে যাওয়ার তাগিদ থাকায় বিয়ের আয়োজন তাড়াতাড়ি করা হয়। ১ আগস্ট রাত ১১টায় দুটি মাইক্রোবাসে বরযাত্রী মেয়ের বাড়িতে যান। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভোর চারটার দিকে সবাই বাড়ি ফেরেন। বাদলের অভিযোগ, অতিরিক্ত মেকআপের কারণে বিয়ের রাতে কনে বদলের বিষয়টি বোঝা যায়নি। তবে বাসররাতে কনে মুখ ধোয়ার পর রায়হান বুঝতে পারেন, যাকে তিনি বিয়ে করেছেন, তিনি আগে দেখানো মেয়ে নন। ২ আগস্ট কনেকে তার বাবার বাড়িতে পাঠানো হয় এবং প্রতারণার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। তাঁদের দাবি, ঘটক ও কনের বাবা পরিকল্পিতভাবে এই প্রতারণা করেছেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে কনের বাবা জিয়ারুল হক বলেন, তাঁর তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেজো মেয়ে জেমিন আক্তার রাণীশংকৈল মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছেলেপক্ষ তাঁদের বাড়িতে এসে মেয়েকে দেখে গেছে। বিয়েতে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী উপস্থিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে কনে বদলের অভিযোগ অবিশ্বাস্য। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিয়ের আগে যৌতুকের কোনো কথা হয়নি। তবে বিয়ের পরদিনই ছেলেপক্ষ ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। সময় চাইলেও তারা রাজি হয়নি। তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করতেই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে ঘটক মোতালেব বলেন, তিনি অন্য কোনো মেয়ে দেখাননি। মেয়েকে দেখানো হয়েছিল মেয়ের বাবার বাড়িতেই। বিয়ের কাজ দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্ত ছেলেপক্ষই নেয়। পরবর্তী ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ছেলেপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, ছেলেপক্ষের অভিযোগ মেয়েপক্ষ ও ঘটক মিলে কনে বদলের মাধ্যমে প্রতারণা করেছে। শুরুতে সমঝোতার আশায় রায়হান কবির জামিনে ছিলেন। কিন্তু সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন পুরোপুরি বিচারাধীন। আদালতের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com