সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
ফাল্গুনের রং, ভালোবাসার আবেশ আর একুশের শ্রদ্ধা-সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি মানেই ফুলের উৎসব। বছরজুড়ে নানা উপলক্ষ থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসে ফুলের চাহিদা যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। দেশের ফুল ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। বসন্ত উৎসব, রোজ ডে, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং বিয়ের মৌসুম-সব মিলিয়ে এক মাসেই জমে ওঠে বছরের বড় অংশের বাণিজ্য।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি বাবুল প্রসাদ জানান, এবার সারা দেশে সব মিলিয়ে ২৪০ কোটি টাকার মতো ব্যবসা হয়েছে। এর মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ফুল বিক্রি হয়েছে ৫০ কোটি টাকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফেব্রুয়ারি মাস ঘিরে আলাদাভাবে টার্গেট থাকে। কারণ এ মাসেই আমাদের বেশি ফুল বিক্রি হয়। রোজ ডে, ভালোবাসা দিবস, পয়লা ফাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিয়ের অনুষ্ঠান-সব মিলিয়ে পুরো বছরের ৫ ভাগের ২ ভাগ ফুল বিক্রি হয় এ মাসেই। তবে এ বছর আমাদের টার্গেট ছিল ৪০০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করার। কিন্তু নির্বাচনের কারণে সেই টার্গেট আমরা পূরণ করতে পারিনি।’
ফুল ব্যবসায়ীদের হিসাবে, নভেম্বর থেকে মার্চ এই পাঁচ মাসই মূল মৌসুম। তবে ফেব্রুয়ারির চাহিদা অন্য সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। সাধারণ দিনে যে পরিমাণ ফুল বিক্রি হয়, ফাল্গুন বা ভালোবাসা দিবসে তা ২ থেকে ৩ গুণ বেড়ে যায়। রাজধানীর শাহবাগে রাত-দিন মিলিয়ে আড়াই শতাধিক ব্যবসায়ী পাইকারি ও খুচরা ফুল বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। এই কেন্দ্র ঘিরেই দেশের বড় অংশের পাইকারি বাজার পরিচালিত হয়।বাংলাদেশ ফুল ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য বলছে, দেশে বছরে ফুলের বাজার দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। উৎপাদন ভালো হলে বাজারের পরিধি আরও বাড়ে। ১৯৯৫ সালে যেখানে অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। আগে চাহিদার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ফুল আমদানি করতে হতো। ১৯৯৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বছরে ১০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার ফুল আমদানি হতো। এখন তা কমে বছরে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকায় নেমেছে; যা মোট চাহিদার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ।
দেশে বর্তমানে ২৪টি জেলায় ফুল চাষ হচ্ছে। যশোরের গদখালি, ঝিকরগাছা, আনিসারা, কালিহাতপুর ও কালিগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ফুল উৎপাদন হয়। পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, নারায়ণগঞ্জের সাবদি বন্দর, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর ও সাভারের গোলাপ গ্রামেও বিস্তৃত হয়েছে চাষাবাদ। দেশীয় উৎপাদন বাড়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা কমেছে। তবে অর্কিড, লিলি, চায়নিজ জিপসির মতো কিছু ফুল এখনো বিদেশ থেকে আনতে হয়।
ফুলশিল্পে উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিছু এলাকায় ফলন কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারদরেও। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস এখন দেশের ফুল ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। এক মাসের বিক্রিতেই ঘুরে দাঁড়ায় বছরের হিসাব। লক্ষ্য পূরণ না হলেও কয়েক শ কোটি টাকার এই বাণিজ্য প্রমাণ করে, বাংলাদেশে অর্থনীতির একটি শক্তিশালী অংশ ফুলবাণিজ্য।