রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন
অনলাইন নিউজ ডেস্ক, ই-কণ্ঠ টোয়েন্টিফোর ডটকম॥ তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের অনেক নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় বাড়িঘর ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বিপাকে পড়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, পশ্চিম ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ী, খগাখড়িবাড়ী, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। এতে সহস্রাধিক পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার ভেঙে গেছে। বাঁধের ভাঙা স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, বাঁধের ভাঙা স্থান দিয়ে পানি ঢুকে পূর্ব খড়িবাড়ী ও টাপুর চরের প্রায় এক হাজার ২০০ পরিবার বন্যাকবলিত হয়েছে। ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ৭০০ পরিবার পানিবন্দি। দুই শতাধিক বিঘার রোপা আমন ক্ষেত পানিতে তলিয়ে আছে।পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি কমলেও অনেক এলাকা এখনো বন্যাকবলিত। ’
চরখড়িবাড়ী গ্রামের রজব আলী (৪৫) বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে আবাদি জমি যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবারের বাড়িঘরে পানি ঢুকছে। ’ পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর গ্রামের কৃষক মিন্টু মিয়া (৩৮) জানান, এবার তিনি আমন আবাদ করেছেন ২৫ বিঘা জমিতে। কিন্তু হঠাৎ তিস্তার বানে এখন সব পানির নিচে তলিয়ে আছে। একই গ্রামের সহিদুল ইসলামের (৩৫) ২০ বিঘা জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে লালমনিরহাটের তিস্তাতীরবর্তী নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবো জানায়, সোমবার বিকেল থেকেই তিস্তার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। গতকাল সকাল ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটের সব খুলে রাখা হয়েছে। ধরলা নদীর পানিও বাড়ছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
জেলার পাটগ্রামের দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, ডাউয়াবাড়ী ও পাটিকাপাড়া, কালীগঞ্জের ভোটমারী ও কাকিনা, আদিতমারীর মহিষখোঁচা এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেকের বাড়িতে হাঁটুপানি। কয়েকটি এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান।
জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোর পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নজরদারির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার প্রস্তুতি চলছে।
কুড়িগ্রামে ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমারসহ সব কটি নদ-নদীর পানি আবার বাড়তে শুরু করেছে। সব নদ-নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার নিচে থাকলেও প্লাবিত হয়েছে চরাঞ্চলের নিচু এলাকা। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নদ-নদীর ভাঙন তীব্র হয়েছে।
দুধকুমারের ভাঙনে কালীগঞ্জ-নাগেশ্বরী সড়কটি ভাঙনের কবলে পড়েছে। কুবরিয়ারপার এলাকায় পাকা সড়কটি ভেঙে গেলে নাগেশ্বরী উপজেলার কালীগঞ্জ, নুনখাওয়া ও ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।
কুড়িগ্রাম পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, ভাঙন ঠেকাতে সেখানে আগে থেকে প্রস্তুত করা বালুর বস্তা ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে চর যাত্রাপুরের বানিয়াপাড়ায় গত এক সপ্তাহে ১২টি পরিবার ভিটামাটি হারিয়েছে।
যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানিয়েছেন, ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় চর যাত্রাপুর বেড়িবাঁধ ও যাত্রাপুর বাজার ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, রসুলপুর ও রাউলিয়ার চরে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই দিনে পাঁচটি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
ধরলা নদীর ভাঙনে গত তিন দিনে মোঘলবাসা ইউনিয়নের শিতাইঝাড় গ্রামের ২০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। নদীগর্ভে চলে গেছে কয়েক একর আবাদি জমি। ভাঙনের শিকার সোনাব্দি মিয়া ও দছিম উদ্দিন জানান, ভাঙা ঘর কোথায় রাখবেন, সে জায়গা না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তাঁরা।
সদর উপজেলার সারডোব এলাকায় আবার ভাঙন শুরু হয়েছে। কয়েক দিনের অব্যাহত ভাঙনে হুমকিতে পড়েছে আরডিআরএস বাজার ও চর সারডোব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ভাঙন ঠেকাতে ওই এলাকায় ৭০ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ করা হয়েছে। গণনা শেষে দ্রুত নদীতে ফেলা হবে।
১৫ দিন ধরে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চণ্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়য়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। ভাঙনের এই প্রবণতা আতঙ্কিত করে তুলেছে এলাকার লোকজনকে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কারেন্ট বাজার ও চর মাদারীপাড়া এলাকায় ১০০ পরিবারের বসতবাড়ি, এক কিলোমিটার রাস্তা, ২০০ হেক্টর ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ওই এলাকায় ভাঙনের মুখে পড়েছে হাজারো বসতবাড়ি, ৫০০ হেক্টর ফসলি জমি ও দুই কিলোমিটার রাস্তা।
হরিপুরের চর মাদারীপুরের খালেক মিয়া বলেন, ‘ভাঙন প্রতিরোধে কেউ এগিয়ে আসেনি। কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকার অবস্থা জানালে তারা শুধু বলে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। ফলে দুই পুরুষের বসতবাড়ি ও আবাদি জমি হারিয়ে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হলাম। ’
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকায় জিও টিউব ও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পাউবো ভাঙন প্রতিরোধে তৎপর আছে।