শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ন

ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ আসন: দুর্গ পুনরুদ্ধারে লড়ছে বিএনপি, জামায়াতে চ্যালেঞ্জ

বিএনপির প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান ও জামায়াত প্রার্থী আব্দুল হক

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি:: দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন দুটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতসহ অন্যান্য দলও নিজেদের অবস্থান জোরালো করার চেষ্টা করছে। গত বুধবার প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে এই দুই আসনে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। হলফনামা সূত্রে জানা গেছে, এই দুই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের চার প্রার্থীই কোটিপতি।

ঢাকা-২ আসন:

ঢাকা-২ আসনে শুরুতে তিনজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা জহিরুল ইসলামের মনোনয়ন। ঋণখেলাপি সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে বাতিল করা হয় জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও রাওয়ার সভাপতি কর্নেল (অব.) আব্দুল হকের মনোনয়ন।

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কর্নেল আব্দুল হক নিজেকে বিএনপির সমর্থক দাবি করে মনোনয়ন প্রত্যাশায় নানা সভা-সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিএনপি এ আসনে আমানউল্লাহ আমানকেই প্রার্থী ঘোষণা করে। এতে তিনি কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। অন্যদিকে জামায়াত শুরুতে ঢাকা জেলা জামায়াতের শূরা সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌফিক হাসানকে নিয়ে প্রচার চালালেও শেষ মুহূর্তে তাঁকে বাদ দিয়ে আব্দুল হককে মনোনয়ন দেয়।

পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে আব্দুল হক তাঁর প্রার্থিতা ফিরে পান। এতে তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হয়। ফলে ঢাকা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমানউল্লাহ আমানের একক আধিপত্য আর থাকছে না। মাঠপর্যায়ে এই আসন এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ঢাকা-২ আসনটি কেরানীগঞ্জ উপজেলার কালিন্দী, শাক্তা, তারানগর, বাস্তা, রোহিতপুর, কলাতিয়া ও হযরতপুর ইউনিয়ন এবং সাভার উপজেলার ভাকুর্তা, আমিনবাজার ও তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৯ হাজার ২০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ৯০৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১ হাজার ২৯৯ জন এবং হিজড়া ভোটার ৯ জন।

মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও আপিল নিষ্পত্তির পর এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বিএনপির প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান (ধানের শীষ), জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক (দাঁড়িপাল্লা) ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. জহিরুল ইসলাম (হাতপাখা)।

গত বুধবার ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমের কার্যালয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও গণভোট উপলক্ষে আচরণবিধি সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা এবং প্রতীক বরাদ্দ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

ওই অনুষ্ঠানে জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আমার আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অনেক সরকারি কর্মকর্তা প্রতিপক্ষ প্রার্থীর আত্মীয়স্বজনদের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হচ্ছে না। যারা আমার সমর্থক ও কর্মী তাঁদের হুমকি-দুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমার নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নিলে তাঁদের ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। এব্যাপারে আপনার (রিটার্নিং কর্মকর্তা) দৃষ্টি কামনা করছি।

সভায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান বলেন, আমরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলবো। এটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

তারানগর এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিম হোসেন (২৪) বলেন, যিনি সংসদে গিয়ে এলাকার শিক্ষা, কর্মসংস্থান আর নাগরিক সুবিধার বিষয়ে কথা বলবেন আমরা তাকে ভোট দিবো। যে প্রার্থী আধুনিক চিন্তা নিয়ে কাজ করতে পারবেন, তাকেই আমি যোগ্য মনে করি।

কলাতিয়া এলাকার বাসিন্দা খায়রুল আলম (৫৩) বলেন, ভোটের সময় সব নেতাই আসে। কিন্তু পরে অনেকেই আর খোঁজ রাখে না। এবার আমি তাকেই ভোট দিতে চাই, যিনি কথা ও কাজে মিল রাখবেন।

কালিন্দী এলাকার গৃহবধূ রোকেয়া বেগম (৩২) বলেন, যে প্রার্থী নারীদের কথা শুনবেন, এলাকায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন, আমি তাকেই ভোট দিবো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও জামায়াত প্রার্থী শাহীনুর ইসলাম

ঢাকা-৩ আসন:    

ঢাকা-৩ আসনের চিত্র তুলনামূলকভাবে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখানে ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাই-বাছাই শেষে নয়জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে বাস্তব চিত্রে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলীয় মনোনীত প্রার্থী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ধানের শীষ) এবং ঢাকা জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ও দলীয় প্রার্থী শাহীনুর ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা) এর মধ্যে।

গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ওই দুই প্রার্থীই সমানতালে মাঠে সক্রিয়। পোস্টার, লিফলেট, উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও তৃণমূল পর্যায়ের সভা-সমাবেশে উভয় পক্ষই জোর প্রচার চালাচ্ছেন। গয়েশ্বর রায় অভিজ্ঞ ও সংগঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে শাহীনুর ইসলাম জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির বার্তা দিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত বিবরণে জানা গেছে, শাহীনুর ইসলাম নিজের ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করছেন।

ঢাকা-৩ আসনটি কেরানীগঞ্জের আগানগর, জিনজিরা, শুভাঢ্যা, কোন্ডা ও তেঘরিয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭১ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪ জন।

এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী মো. বাচ্চু ভূঁইয়া (মাথাল), ইসলামী অন্দোলনের প্রার্থী সুলতান আহম্মেদ খাঁন (হাতপাখা), গণফোরামের প্রার্থী রওশন ইয়াজদানি (উদীয়মান সূর্য), বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী মোহাম্মদ জাফর (ডাব), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর প্রার্থী মজিবুর হাওলাদার (মই), গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. সাজ্জাদ (ট্রাক), ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. ফারুক (লাঙ্গল)। তবে মাঠপর্যায়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শাহীনুর ইসলাম ও বাচ্চু ভূঁইয়া ছাড়া বাকিদের তেমন দৃশ্যমান প্রচার-প্রচারণা নেই।

প্রতীক বরাদ্দ অনুষ্ঠানে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী শাহীনুর ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সমাজে এখন অনেকের হাতে অস্ত্র আছে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হলে অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। অস্ত্রধারীদের অবশ্যই গ্রেপ্তার করতে হবে। নয়তো অস্ত্রধারীদের ভয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। এ অবস্থায় জনগণ ভোটকেন্দ্রে যাবে কিনা সেটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে। তাই ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করছি।

শুভাঢ্যা এলাকার বাসিন্দা কলেজ শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান (২৫) বলেন, এবার আমার প্রথম ভোট। আমাদের এলাকায় খেলাধুলার মাঠ নেই, তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। যিনি মাদকমুক্ত সমাজ আর তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করবেন আমি তাকেই ভোট দেব।

আগানগর এলাকার গৃহবধূ সীমা আক্তার (২৮) বলেন, আমরা এমন এমপি (সংসদ সদস্য) চাই। যিনি সংসদে আমাদের এলাকার সমস্যা তুলে ধরবেন ও নিয়মিত এলাকাবাসীর খোঁজখবর রাখবেন।

ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা-২ আসনটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে হাতবদল হয়েছে। ১৯৯১, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ১৯৯৬ ও ২০০১ সাল পর্যন্ত চার বার বিএনপির প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান (তৎকালীন ঢাকা-৩) থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ টানা চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের দখলে ছিল।

অন্যদিকে, ঢাকা-৩ আসনটিও অতীতে বিভিন্ন দলের মধ্যে হাতবদল হয়েছে। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এ আসনে জয়লাভ করে। ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে টানা চারবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ আসনে জয়ী হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com