রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
জ্বালানিসংকটের বিরূপ প্রভাব পড়ছে জীবন-জীবিকায়। জ্বালানি তেলের মাধ্যমে যাদের জীবন-জীবিকা চলে, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। এ সংকটের কারণে তাদের আয়-রোজগারেও টান পড়েছে। কৃষিতে ফসলের সেচ, যানবাহন চলাচল, শিল্প-কারখানার উৎপাদন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সার্বিক ভাবে দেখা দিচ্ছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় সব ধরনের জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে কৃষিপণ্য অর্থাৎ শস্য উৎপাদনে সেচ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পেট্রল-অকটেন না পাওয়ায় পাঠাও-উবারের মতো রাইডশেয়ারিং সার্ভিস ব্যাহত হচ্ছে, যা তাদের প্রতিদিনের রোজগারে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ছোট-বড় কারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জেনারেটরের ডিজেল ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বাসাবাড়ি বা রেস্টুরেন্টসহ নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এলপিজি বা গ্যাসের সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে এলপিজি গ্যাসের দামও কোথাও কোথাও সংকটের সুযোগে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা। পাশাপাশি গতকাল রাজধানীর একাধিক সিএনজি স্টেশনে গ্যাস ছিল না বলেও জানা যায়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সবজি ব্যবসায়ী রহিম মিয়া বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাজারসহ সবখানে তার প্রভাব পড়েছে। শাকসবজির দামে আগুন লেগেছে। পটোল, ঢ্যাঁড়স, ঝিঙ্গা, বেগুনসহ সব সবজির পাইকারি দামই এখন ১০০ টাকার কাছাকাছি।
কারওয়ান বাজারের একাধিক আড়তদার বলেছেন, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তাই আড়তে আসা ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম চড়াচ্ছেন। এতে খুচরা ক্রেতারা বিপাকে পড়ছেন। তবে সার্বিকভাবে কেনাবেচাও কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেন জানান, সাড়ে ১২ কেজির এলপিজির সিলিন্ডার এখন স্থানীয় বাজারের দোকানে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহে এই সিলিন্ডার পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। যদিও সরকারি রেট বা নির্ধারিত মূল্য আরও কম। কিন্তু প্রায় বেশির ভাগ দোকানেই সরকারি রেটে সিলিন্ডার বিক্রি করা হয় না। এর মাঝে জ্বালানিসংকট বাড়তে থাকলে বাসাবাড়িতে রান্নাও বন্ধ হতে পারে।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চট্টগ্রাম নগরীতে রাইডশেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালান। দীর্ঘ সময়ে পথ চলার মধ্যে কখনো এভাবে জ্বালানিসংকটে পড়তে হয়নি। কখনো দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়নি। এবারই চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হলো তাকে। আলাপকালে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘অনেকেই প্রয়োজন ছাড়াই বাইকের ট্যাংকি ভর্তি করে রাখছেন তেল। তাদের কারণে যাদের প্রয়োজন তারা তেল পাচ্ছেন না।’
চট্টগ্রামের হাজারও বাইক রাইডারের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে জ্বালানিসংকট। দেশজুড়ে চলমান জ্বালানিসংকটের কারণে রাইডশেয়ারিং খাতে নেমে এসেছে অচলাবস্থা। বিশেষ করে মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইডশেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হাজারও চালকের চোখে অন্ধকার।
জ্বালানি তেলের সংকটে রংপুর অঞ্চলে ব্যাহত হচ্ছে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম। ফলে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকদের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষিব্যবস্থায়।
কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো ডিজেল না পাওয়া, সীমিত সরবরাহ এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদে অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তবে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনে মনোযোগী হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন কৃষকরা।
মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৩০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক একর জমিতে মাটির ধরন অনুযায়ী বোরো চাষে ১৫ থেকে ২০ বার সেচ দিতে হয়। এতে প্রয়োজন হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই ডিজেলসংকটের কারণে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
গত শুক্রবার রংপুর-পার্বতীপুর সড়কে খালেক তেল পাম্পে কথা হয় নওশাদ আলীর সঙ্গে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘দুইটা-তিনটা তেলের পাম্প ঘুরলাম শেষে ৩ নম্বর তেল পাম্প এসে দুই লিটার ডিজেল পাইলাম। ২০০ টাকার ডিজেল নিতে আমার যাতায়াত খরচ ১২০ টাকা। এই তেলে ৪ ঘণ্টাও মেশিন চলবে না। এবার যে ধানের কী হবে, তা আল্লাহ ভালো জানেন।’
খালেক পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক জানান, যারা ডিজেলের জন্য আসছেন তাদের দুই থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। তেল থাকলে যেকোনো সময়ে এসে নিতে পারবে।
রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা পাম্প থেকে ঠিকমতো ডিজেল পাচ্ছি না। প্রতি মেশিনে দুই লিটারের বেশি দিচ্ছে না। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা হলেও তা সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা পরিবহন খরচ লাগছে। এতে আমাদের লাভ তো দূরের কথা, খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে যাবে।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলে ডিজেলসংকটে কিছুটা সমস্যা হলেও গুরুতর সমস্যা আমাদের চোখে পড়েনি। প্রকৃতি আমাদের কিছুটা ভালো অবস্থায় রেখেছে।’
গোপালগঞ্জে তীব্র জ্বালানিসংকটে কৃষি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে না পেরে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করেও মিলছে না প্রয়োজনীয় তেল। এতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এবং বাজারে কঠোর নজরদারি না বাড়ালে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে সচেতন মহল।
জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নেই। ফলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। কৃষি কার্ড দেখিয়েও প্রয়োজনমতো তেল মিলছে না। এ ছাড়া বর্তমানে বোরো মৌসুম চলছে। এই সময়ে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। কৃষকরা বলছেন, সেচ না দিতে পারলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এরই মধ্যে অনেক জমিতে ধানগাছে শিষ এসেছে। কিন্তু পানি না পেলে এসব শিষ থেকে আসা ধান চিটা হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে এরই মধ্যে অনেক জমি পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, যা পুরো মৌসুমে কৃষিকাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক শারফুল শরীফ বলেন, ‘প্রতিদিন আমার কমপক্ষে পাঁচ লিটার তেল দরকার। পাঁচ দিন আগে মাত্র এক লিটার তেল পেয়েছিলাম। এতে তিন-চার দিন জমিতে সেচ দিতে পারিনি। আজ আবার ভোরে পাম্পে এসেছি। ৩ ঘণ্টা পার হলেও তেল পাইনি। যদি এভাবে চলতে থাকে, আমার জমির সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে সারা বছর পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে?’
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে জ্বালানি তেলের সংকট চরমে পৌঁছেছে। দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকার চলাচল কমে গেছে। অনেক জায়গায় নৌকা বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন চিলমারী উপজেলার জেলেরা। ডিজেলের অভাবে নৌকা চালাতে না পারায় তারা নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। এতে তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।
এমন অবস্থায় গত মঙ্গলবার দুপুরে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তারা দীর্ঘ সময় সেখানে বিক্ষোভ করেন। পরে ইউএনও তাদের সঠিক দামে তেল দেওয়ার আশ্বাস দেন। এরপর জেলেরা সেখান থেকে চলে যান। তবে তারা অভিযোগ করেন, ডিলারদের কাছে তেল থাকলেও তারা দিচ্ছেন না। বেশি টাকা দিলেই তেল মিলছে। প্রশাসন এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
মো. আশরাফ নামে জেলে বলেন, ‘আমাদের তেমন টাকা জমানো থাকে না। যেটুকু জমানো ছিল তাও শেষ। এখন ধারদেনা করে তেল কিনতে হচ্ছে। তবু তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার নিয়ে চিন্তায় আছি।’
নাগেশ্বরীর আয়নালের ঘাটের ইজারাদার আবু সিদ্দিক বলেন, ‘কয়েক দিন আগে কয়েকটি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে কিছু তেল নিয়েছি। এখন তাও শেষ হয়ে গেছে। এতে নৌকা চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান তেলের সংকটের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার কাছে সব তথ্য আছে। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’