বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি, কেরানীগঞ্জ ॥
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে ঘিরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজারে জমে উঠেছে কেনাবেচা। রমজানের শুরু থেকেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠছে পোশাকপল্লির বিপণিবিতানগুলো। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এবার ঈদকে কেন্দ্র করে বিক্রি সাত হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর, পূর্ব আগানগর, চরকালীগঞ্জ, কালীগঞ্জ, খেজুরবাগসহ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লি। এখানে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার শোরুম ও পাঁচ হাজার ছোট-বড় কারখানা। কয়েক লাখ শ্রমিক এসব কারখানা ও বিপণিবিতানে কাজ করছেন।
গতকাল মঙ্গলবার (০৩ মার্চ ২০২৬) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আগানগর, তানাকা মার্কেট, আশা কমপ্লেক্স, খাজা মার্কেট, জেলা পরিষদ মার্কেট, এস আলম সুপার মার্কেট, নুর সুপার মার্কেট, চৌধুরী মার্কেট ও আলম সুপার মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, বিপণিবিতানগুলোতে পাইকারদের ভিড়। কর্মচারীরা পাইকারদের টানতে হাঁকডাক দিচ্ছেন। পাইকাররা তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য যাচাই-বাছাই শেষে দরদাম করছেন। অন্যদিকে কারখানাগুলোতে চলছে সেলাই, সুতা বাছাই ও মোড়কীকরণের কাজ।
জেলা পরিষদ মার্কেটের ট্রেন্ডি ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী শোয়েব হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলার মার্কেট, শপিংমল, এমনকি ফুটপাতের দোকানিরাও এখান থেকে পোশাক কিনে নিয়ে যান। আমাদের পণ্যের দাম তুলনামূলক কম ও মান ভালো। পুরনো ক্রেতারাই বেশি আসেন, তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
নুর সুপার মার্কেটের আলিফা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী কামরুল ইসলাম বলের, গত বছরের তুলনায় কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ফ্যাব্রিক, সুতা, অ্যাকসেসরিজ সব কিছুর দামই বেড়েছে। এতে পোশাকের পাইকারি দামও কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি দাম যতটুকু সম্ভব কম রাখতে।
আলম সুপার মার্কেটের ফ্যাশন হাউজের পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের শোরুমে শিশু ও নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পোশাক রয়েছে। শিশুদের পোশাক পাইকারিতে শুরু ১২০ টাকা থেকে। আর প্রিমিয়াম কালেকশন ১২০০ টাকা পর্যন্ত। পুরুষদের ডেনিম প্যান্ট রয়েছে ৪৫০ থেকে ১১শ টাকা পর্যন্ত। আর টি-শার্ট রয়েছে ২০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত। পাইকারদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা সব বাজেটের পণ্যই রাখছি।
চরকালীগঞ্জ এলাকার ম্যাক্স ফ্যাশনের স্বত্ত্বাধিকারী আরিফ হোসেন বলেন, এবার বিশেষ করে রেডিমেড পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। কেননা ঈদের নামাজ পড়ার জন্য বেশিরভাগ কিশোর, তরুণ ও যুবক নতুন পাঞ্জাবি কেনেন। তিনি আরও বলেন, এবার কয়েকটি নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি তৈরি করেছি। আমার শোরুমে ৪৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের পাঞ্জাবি রয়েছে।
কুমিল্লা থেকে আসা পাইকার মিজান আলী ইতোমধ্যে প্রায় ১৬ হাজার টাকার পোশাক কিনেছেন। আরও কেনাকাটার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, এখানে এক জায়গায় অনেক ডিজাইন পাওয়া যায়। দামও তুলনামূলক কম। তাই প্রতিবছর এখান থেকে পোশাক কিনে নিয়ে যাই।
রাজশাহী থেকে আসা আরেক পাইকার রেজাউল করিম বলেন, ভোর বেলা রওনা দিয়ে সকাল সাড়ে ১০ দিকে পৌঁছেছি। শোরুম ঘুরে ঘুরে পোশাকের কালেকশন দেখছি। এ দফায় বেশ কিছু মালামাল নিয়ে যাবো। যদি খুচরা বেচাবিক্রি ভালো হয় তবে ঈদের আগে আরেক দফা আসবো।
খাজা সুপার মার্কেট বিপণিবিতান থেকে বেছে বেছে তৈরি পোশাক কিনছেন বগুড়া থেকে আসা পাইকার মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, এবার বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। খুচরা ক্রেতারা আগের মতো শুধু কম দামের দিকে তাকিয়ে থাকে না। তারা নতুন ডিজাইন, কাপড়ের কোয়ালিটি ও ফিনিশিংও দেখছেন। তাই আমাদেরও বেছে বেছে পণ্য কিনতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ বছর পোশাকের দাম কিছুটা বেশি। তাই লাভ তেমন হবে না। তারপরও ঈদ মৌসুমে বিক্রি ভালো হলে সেই ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
এবারের ঈদে বেচাকেনা ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এবারের রোজার ঈদের ব্যবসায়ের পরিবেশ ভালো। প্রতিটি মার্কেটে খবর নিয়ে দেখেছি মানুষ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে কেনাকাটা করছেন। পাইকাররাও খুব খুশি।
তিনি আরও বলেন, পোশাকপল্লি এলাকায় নিরাপত্তাজনিত কিছু সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পাইকারদের আনাগোনা আরও বাড়বে।