বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন

আজকের রাত পোহালেই ভোট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আজকের রাত পোহালেই সকাল থেকে শুরু হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬। সব সংশয়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। শেষ হচ্ছে ভোট নিয়ে নানা উদ্বেগ ও জল্পনা-কল্পনার। ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও কৌতূহলের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে।

কাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে ভোট গ্রহণ চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এবারে সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোট গ্রহণের সময় অন্যবারের চেয়ে এক ঘণ্টা বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিশেষ এক পরিস্থিতির মধ্যে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই বাড়তি নজর বা কৌতূহল রয়েছে সবখানে। সারা বিশ্ব নজর রাখছে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। ফলে সুষ্ঠু-সুন্দর, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ভোট বা নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ইসি তথা অন্তর্বর্তী সরকার।

এবারের নির্বাচনে মাঠে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এর বাইরেও জাতীয় পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল এককভাবে ভোটে অংশ নিয়েছে। তবে এবার ভোটের মাঠে নেই দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর টানা শাসন করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় নির্বাচনের বাইরে রয়েছে দলটি।

এমন প্রেক্ষাপটে বাড়তি সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারপরও ভোট গ্রহণের দিন বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এরই মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ, এমনকি হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার নেত্রকোনায় চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এ ছাড়া গতকাল ঝালকাঠিতে জামায়াতের কার্যালয়ে আগুনের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় জামায়াত এই ঘটনাকে নির্বাচনি প্রতিহিংসার জের বলে সন্দেহ করেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।’

বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল ও জোট চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল বা জোটগুলো হলো বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), গণতন্ত্র মঞ্চের নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতৃত্বাধীন ১২-দলীয় জোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ১১টি দল ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য। তবে শেষ মুহূর্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও যুক্ত হয়েছে এই জোটে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোট ১১টি দল নিয়ে জোটবদ্ধভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করছে। দলগুলো হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রের্টিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের জন্য ৩০০ আসনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। পরে শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে ২৯৯ আসনে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটের মাঠে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ। ইসির তথ্যমতে, এবার সারা দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ, যার মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন। এসব আসনে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ২ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি ভোটকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ঢাকা।

গত সোমবার ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণ চলার সময় নির্বাচনি পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দুই ঘণ্টা পরপর ভোটের হার সংগ্রহ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোট গ্রহণের দিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু করে বেসরকারি ফলাফল পাওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এই নির্বাচনে মাঠে মোতায়েন রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় ১ লাখ সদস্য, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ সদস্য। দেশের ইতিহাসে সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর এতসংখ্যক সদস্য আর কখনোই কোনো নির্বাচনে মোতায়েন করা হয়নি। এর বাইরেও বাংলাদেশ পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, র‌্যাবের ৭ হাজার ৭০০, এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্যসহ সর্বমোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন থাকবেন।

অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে গত রবিবার থেকে তারা সারা দেশে দুই পর্বে সাত দিনের (ভোটের আগে পরে) জন্য বিশেষ দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। পাশাপাশি এই সময়ে ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, এবার নির্বাচনে সারা দেশে (মহানগর এলাকার বাইরে) প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৮ জন নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এ ছাড়া মহানগর এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন মোতায়েন থাকবেন। দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন থাকবেন ১৬ থেকে ১৮ জন করে সদস্য।

গতকাল পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া পুলিশ সুপাররা ড্রোন ব্যবহার করবেন।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com