শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি॥
৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-৩ সদর আসন। বর্তমানে এই আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দখলে। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে লালমনিরহাটের-৩ সদর আসনে শুরু হয়েছে বিএনপি প্রার্থী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী জি এম কাদেরের নেতাকর্মীর মাঝে দৌড়ঝাঁপ। বইতে শুরু করেছে লালমনিরহাটে নির্বাচনী হওয়া। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জাতীয় পার্টির মধ্যে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি এবং লড়াইয়ের আভাস। যদিও মহাজোটের শরিক দল হিসেবে এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জি এম কাদেরকে মনোনীত করা হয়েছে। যার কারনে এই আসনে আওয়ামীলীগের কোন প্রার্থী নেই। তাই এই দুই এমপি প্রার্থীর নেতাকর্মীরা প্রচার-প্রচারণায় বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ অঞ্চলে জাতীয় পার্টি জনপ্রিয় একটি দল। আর মাত্র একমাস বাকী এর মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। দুই দলের প্রার্থী তাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছেন। এছাড়াও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে জনসংযোগ বৃদ্ধির জন্য বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। এই দুই প্রার্থীর জনসংযোগে ব্যস্ত সময়ই বলে দিচ্ছে যে, নির্বাচন ঘুনিয়ে এসেছে, আর বেশী দিন নেই।
স্বাধীনতার পর এই আসনে আওয়ামীলীগ বিজয়ী হয়েছিল। ৭৫ এর পর এই আসন বিএনপির দখলে চলে যায়। বিএনপির পর আসনটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হয়। শুধু একবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল হোসেন বিজয়ী হয়েছিলেন। ৫ম সংসদীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জেলার তিনটি আসনেই বিজয়ী হয়। ৬ষ্ঠ সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। ৭ম সংসদীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আবার এই আসনে বিজয়ী হয়। ৮ম সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী বিপুল ভোটে এই আসনে জয় লাভ করে। ৯ম সংসদীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের বিজয়ী হয়। ১০ম সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবু সালেহ মো. সাঈদ দুলাল বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় বিজয়ী হয়। একাদশ সংসদীয় নির্বাচন দলভিত্তিক হওয়ায় এই আসনটি আওয়ামীলীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়ায় জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মধ্যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। যেহেতু এর আগে জি এম কাদের এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এই আসনের সাধারন ভোটারদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখেন নাই এবং এই জেলায় পা রাখেন নি তাই বিএনপি প্রার্থী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর রাস্তা অনেকটা পরিস্কার। ভোটাররা বলছেন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হয় তাহলে কোন শক্তিই পারবেনা দুলুকে পরাজিত করতে। তাই জোট ভিত্তিক নির্বাচন হওয়ায় মহাজোট প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির কঠিন লড়াই হবে। আবার নির্বাচনী মোড় অনেকটা পাল্টেও যেতে পারে। যদি ভোটাররা বেঈমানী না করে।
৯টি ইউনিয়ন ও একটিপৌরসভা নিয়ে লালমনিরহাট সদর-৩ আসন গঠিত। এক সময়ের জাতীয়পার্টির দুর্গ বলে খ্যাত লালমনিরহাট-৩ আসনে বরাবরেই রাজপথ দখলে রেখে এসেছে আ’লীগ। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে বিএনপি’র সাথে কখনই পেরে উঠতে পারে নি তারা। যদিও বর্তমানে এই আসনে রয়েছে আ’লীগের এমপি। সেটাও আবার গত ৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার কারনে। প্রার্থী সিলেকশন হওয়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে লালমনিরহাটে-৩ আসনে শুরু হয়েছে দুই দলেরই নেতাকর্মীদের কর্ম ব্যস্ততা। এখানে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনের হাওয়া। এ অঞ্চলে এক সময় জাতীয় পার্টি খুবই একটা জনপ্রিয় দল হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে আলোচনায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি তিন দলেই আলোচনায় থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়। শুরু থেকেই এই আসনে বিএনপির একক প্রার্থী নিশ্চিত ছিল। এছাড়া এই আসনে আসনে জাসদ ছাড়া অন্য দলের কারো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি।
গত নির্বাচনে অংশ না নেয়া বিএনপি অত্যান্ত শক্তিশালি একটি দল ছিল। যদিও জেলা বিএনপির গুটি তয়েক নেতাকর্মী একাধিক ভাগে বিভক্ত। তারপরেও সবাই কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর অনুসারী। ক্ষমতার মসনদে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগও লালমনিরহাটে শক্ত অবস্থানে ছিল। কিন্তু কি কারনে এই আসনটি আওয়ামীলীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিল এই নিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে চলছে জল্পনা-কল্পনা। তারপরেও জাতীয় পার্টি বসে ছিল না আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয়পার্টির নেতাকর্মীরাও মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে আগের মতো বর্তমানে জাতীয়পার্টির তেমন কোন কর্মসুচি চোখে পড়ে না। বললে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ার মতো। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের ছোট ভাই ও পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বর্তমানে লালমনিরহাটে সফরে আসেন না বললেই হয়। এরপরেও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আগামী সংসদ নির্বাচন এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে জেলাবাসী মনে করছেন। তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ন আসন হলো লালমনিরহাট-৩ সদর এই আসনটি।
জাতীয় পার্টি থেকে জেলা জাপার সদস্য সচিব অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম মিঠুও মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছিলেন কিন্তু সেন্ট্রাল নেতারা যোগ্যতার বিচারে তাকে প্রার্থী হিসেবে রাখেন নাই। এই আসনে মিঠু জাপার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে জোর তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত জি এম কাদেরের কাছে পাত্তা পাননি। তাই মিঠু এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সাধারন ভোটারদের মধ্যে ভোটে জাপা প্রার্থীর অনেকটা প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে সদর আসনে গণসংযোগে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। সদর আসনে তিনি বিএনপির একক প্রার্থী। এরই মধ্যে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনের কাজসহ দুর্নীতিবিরোধী সাইকেল র্যালি করে নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থীর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেন স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম মিঠু। আর এই আসনে মশাল প্রতীক নিয়ে এবারও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলা জাসদ সভাপতি এম খোরশেদ আলম। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন করবেন কিনা জাসদের কেন্দ্রীয় নেতারা এ ব্যাপারে কোন চিঠি বা কোন নির্দেশনা প্রদান করেন নাই।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগীয়) অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আগামী নির্বাচনে এ জেলার মানুষ ধানের শীষে ভোট দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার গঠনে বিশেষ ভুমিকা রাখবে। আ’লীগের গত নির্বাচনে এই জেলার মানুষ কেন্দ্রে না গিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন এখানে একমাত্র বিএনপি’র প্রার্থীই এমপি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তিনি আরও বলেন, আ’লীগ জানে এই আসনে প্রার্থী দিলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হতে পারে তাই পরাজিত নিশ্চিত ভেবেই তারা এই আসনটি জাপাকে ছেড়ে দেয়। তবে জেলা আ’লীগের সাধারন সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান জোড় দাবী করে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে লালমনিরহাট জেলায় এই আ’লীগ সরকারের আমলে সর্বোচ্ছ উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তাই আমার বিশ্বাস জেলার মানুষ জোটের প্রার্থী জিএম কাদেরের লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিয়ে তাকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার সরকার গঠনে বিশেষ অবদান রাখবে।
জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন না পাওয়া জেলা জাপার সদস্য সচিব অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম মিঠু বলেন, তিনি নিশ্চিত ছিলেন এই আসনে জাপা থেকে তাকে প্রার্থীতা দেয়া হবে। কিন্তু কি কারনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হলো না তা তার বোধগম্য হচ্ছে না। তারপরেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং ভোটার তাকে ভোট দিয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবেন বলে তিনি বিশ্বস করেন।
জেলা জাসদের সভাপতি এম খোরশেদ আলম বলেন, এখন পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে তিনি কোন নির্দেশনা বা কোন চিঠি পাননি নির্বাচন করবেন করবেন কিনা। কেন্দ্রের নির্দেশনা মোতাবেক নির্ভও করছে নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া। তারপরেও এই জেলায় জাসদ নামে যে আরও একটি দল আছে সেটা জানাতেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে তিনি পুরো প্রস্তুত আছেন বলে জানান।