রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি::
পর্যাপ্ত জনবল, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ঔষুধের অভাবে রোগী শুন্য হয়ে পড়েছে লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালটি। এক সময় রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও বাইরের দুর দুরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ এখানে চিকিৎসা সেবা নিতে আসত। এখন হাসপাতাল জুড়ে শুন-সান নীরবতা দেখে মনে হয়- রেলওয়ে হাসপাতালটি যেন এখন নিজেই রোগী। সেখানে আর লোকজন না যাওয়ায় হাসপাতালটি যেন এখন ভুতুরে এলাকায় পরিনত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটি মাদকসেবীদের দখলে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাত দিনের মধ্যে আউটডোর খোলা থাকে মাত্র ৪দিন। আর এ ৪ দিনে সর্বসাকুল্যে সেখান থেকে ১৫-২০ জন রোগী চিকিৎসা নেয়। তাও আবার সেই সব রোগী রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের লোকজন। এখন আর বাইরের থেকে কোন লোক সেখানে চিকিৎসা সেবা নিতে আসে না। তবে হাসপাতালের ইনডোরের অবস্থা আরো শোচনীয়। ৩২ শয্যার হাসপাতালে কোন রোগীই থাকে না মাঝে মধ্যে সেখানে দু-একজন ভর্তি থাকে। সেই রোগীও আবার সেখানে আসে একেবারে নিরুপায় হওয়ার কারনে অথবা কোন দারিদ্র পরিবারের। মেডিকেল অফিসার, সহকারী মেডিকেল অফিসার ও পাঁচজন সহকারী সার্জনের পদ বহুদিন ধরে শুন্য থাকার কারনে এ দুরাবস্থা। যিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন, তাকেই রোগী দেখতে হয়। আবার সপ্তাহে একদিন পার্ববতীপুরেও বসতে হয় তাকে।
হাসপাতালের ইনডোর সেবার কাজে নিয়োজিত সিস্টার ইনচার্জ মহসিনা বেগম বলেন, এই রেলওয়ে হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ঔষুধ ও সেবার মান ভাল থাকায় একসময় এখানে প্রচুর রোগী আসত। এখন চিকিৎসক নেই, নেই ঔষুধ সরবরাহ। তাই এখন আর রোগীও আসে না এখানে।
জানা যায়, হাসপাতালটি ১৯৩৯ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার অধীনে ছিল। ১৯৭৯ সালের ১৫ জানুয়ারি লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ের অধীনে হাসপাতালটি দেয়া হয়। ৩২ শয্যার হাসপাতালটিতে ৯টি নারী ও ১৮টি পুরুষ শয্যার পাশাপাশি সেখানে ৫টি কেবিনও রয়েছে। হাসপাতালের মঞ্জুরীকৃত ২৪৭টি জনবলের বিপরীতে বর্তমানে ১৩২টি পদ শুণ্য, যার অধিকাংশই গুরুত্বপূর্ণ পদবী।
লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান সহকারী সারাফত হোসেন জানান, চিকিৎসকের ৭টি পদের মধ্যে ডিএমও ছাড়া সবক’টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শুন্য। গুরুত্বপূর্ণ ওইসব পদের মধ্যে সিস্টার ইনচার্জ, স্টোর কিপার, প্রধান সহকারী, স্টোনোগ্রাফার, টাইপিস্ট, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী, এক্স-রে অ্যাটেনডেন্ট, ওটি অ্যাসিস্ট্যান্ট, স্যানেটারি পরিদর্শক পদগুলো দির্ঘদিন ধরে শুণ্য। হাসপাতালের নামে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও চালক থাকলেও কোনো কাজে আসছে না।
সরেজমিনে হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, রেলের কয়েকজন কর্মচারী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর মধ্যে ৮০ বছরের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুস সোবহান। কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, খামাখা জনগণের টাকা অপচয় না করে এ হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া উচিত। এসময় চিকিৎসা নিতে এসে হতাশার কথা জানান আরো কয়েক জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী।
লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালের ডিভিশনাল রেলওয়ে মেডিকেল অফিসার (ডিএমও) ডা. মোঃ আনিছুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ে পুলিশ যেমন পুলিশ বিভাগের অধীনে থেকে সেবা দিচ্ছে। তেমনি হাসপাতালটি রেলওয়ের অধীনে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিলে কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে। তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণে হাসপাতালটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় নেয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি। ৯০ দশকের পর রেলওয়ের এই হাসপাতালটিতে প্রচুর রোগী আসতো চিকিৎসা সেবা নিতে। হাসপাতালের পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও লোকবল কম এবং প্রয়োজনীয় ঔষুধ পত্র না থাকায় বর্তমানে এখানে রোগীর সংখ্যা একেবারেই কমে এসেছে। তবে সরকার যদি হাসপাতালটিতে একটু সুনজর দেয় তাহলে আবারও হাসপাতালটিকে পুর্বেও জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এখন আগের মতো হাসপাতালে লোকজন ও রোগী না আসায় এলাকাটি মাদক সেবীদের অভোয়ারন্যে পরিনত হয়েছে।
লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাসপাতালটির এই দুরাবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য প্রতি মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জনবল চেয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সম্ভবত হাসপাতালে দুই-তিনজন চিকিৎসক আমরা পাব। তারা হাসপাতালে যোগ দিলে কিছুটা দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে জানান তিনি। তবে খুব তারাতারি এসব সমস্যা থেকে হাসপাতালটি বের হয়ে আসবে বলে তিনি জানান।