সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন
রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি ॥
বসন্ত মানেই কি কেবল শিমুলপলাশের রক্তিম উৎসব? নাগরিক কোলাহল আর ইটকাঠের জঙ্গল থেকে দৃষ্টি সরালে উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে এখন দেখা মিলবে ভিন্ন এক রূপের। অযত্ন অবহেলায় বেড়ে ওঠা বুনো ফুল ‘ভাট’, স্থানীয়দের কাছে যা ‘বনজুঁই’ নামে বেশি পরিচিত সেই ফুলের শুভ্রতায় ঢেকে গেছে গ্রামবাংলার মেঠোপথ।
গ্রামের পরিত্যক্ত মাঠ, পুরোনো ভিটে কিংবা পথের ধারে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা সাদা ফুল যেন প্রকৃতিকে সাজিয়েছে স্নিগ্ধ এক চাদরে। দিনের আলোয় এর সৌন্দর্য চোখ জুড়ায়, আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে মায়াবী সুবাস। ফুলের গন্ধ আর মৌমাছির গুঞ্জনে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।
ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলা ৮টি ইউনিয়ন ধর্মগড়, নেকমরদ, হোসেনগাঁও, লেহেম্বা, বাচোর, কাশিপুর, রাতোর ও নন্দুয়ার এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। উপজেলার ১২৪টি মৌজা ও গ্রামজুড়ে এখন ভাট ফুলের জয়জয়কার। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এই বনজুঁই যেন প্রকৃতির আপন খেয়ালে গ্রামবাংলাকে সাজিয়ে তুলেছে।উপজেলার গোগোর গ্রামের বাসিন্দা মো হানিফা বলেন, বাড়ি থেকে বের হলেই মেঠোপথ। দুধারে ফুটে আছে ভাট ফুল।
এই শুভ্রতা আর গন্ধে সত্যিই মনটা ভরে যায়।স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রসুল মিয়া কবির ভাষা ধার করে বলেন,তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়কবির সেই আহ্বান যেন আজও জীবন্ত হয়ে আছে গ্রামবাংলার এই অবহেলিত ফুলের মাঝে।তবে এই সৌন্দর্যের মাঝেও প্রবীণদের কণ্ঠে শোনা যায় আক্ষেপ।
৭০ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ রাইতু স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, একসময় গ্রাম যেন স্বর্গ ছিল। আধুনিক নগরায়ণের দাপটে সেই স্বর্গ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।একই সুর শোনা যায় প্রকৃতিপ্রেমী আবু মহিউদ্দিনের কণ্ঠেও।
তাঁর মতে, আধুনিকতার চাপে গ্রামীণ সৌন্দর্য ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নীলিমা মুর্মুও বলেন, আমরা প্রকৃতির ওপর ভরসা করেই বেঁচে ছিলাম। কিন্তু শহরনগর বাড়তে থাকায় আমাদের সেই সম্পর্ক আজ সংকটে।প্রকৃতির এই বুনো সৌন্দর্যের রয়েছে আরেকটি দিকও।
ভাট ফুল শুধু চোখের প্রশান্তিই দেয় না, জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফুলের মধু সংগ্রহে মৌমাছিরা ভিড় জমায়, যা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।এ ছাড়া ভাট গাছের রয়েছে নানা ভেষজ গুণ। চর্মরোগ, জ্বর, অ্যাজমা কিংবা বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে এর পাতা ও মূল বহুদিন ধরেই লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহত হয়ে আসছে।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ভেষজ চিকিৎসক আব্দুল সালাম বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই ভাট গাছ নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহত হয়ে আসছে। বিশেষ করে চর্মরোগ ও পোকামাকড়ের কামড়ে এটি বেশ কার্যকর একটি ভেষজ উদ্ভিদ।অযত্নে বেড়ে ওঠা এই সাদা ফুলগুলো যেন মনে করিয়ে দেয়বাংলার প্রকৃতি এখনো তার সবটুকু সৌন্দর্য উজাড় করে সাজিয়ে রেখেছে নিজেকে। ব্যস্ততা ভুলে মেঠোপথের এই শুভ্রতার মাঝে কিছুটা সময় কাটালে পথিকের ক্লান্তি যেন নিমিষেই মিলিয়ে যায়।