শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন
ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ ফরিদপুরে মধুমতি ও পদ্মা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১৫ দিনের ভাঙনে একাধিক বসতবাড়ি, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকিতে রয়েছে হাজারও বসতবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাদি জমি, খেলার মাঠ, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঈদগাহ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন আতংকে নির্ঘুম রাত কাটছে পদ্মা-মধুমতি তীরের বাসিন্দাদের।
জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার মধুমতি নদীর ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প অনুমোদনের আশ্বাস স্বপ্নই রয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে মধুমতি নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার তিন ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম।
গত ১৫ দিনের ভাঙনে একাধিক বসতবাড়ি, ফসলী জমি, ধমীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে বসতবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাদি জমি, খেলার মাঠ, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঈদগাহসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
মধুমতির পানি হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার পাচুড়িয়া, টগরবন্দ ও গোপালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অন্তত ১০ গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মধুমতির লাগামহীন ভাঙন এলাকাবাসীর ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে পাচুড়িয়া ও টগরবন্দ ইউনিয়নের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
পাচুড়িয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ চরনারানদিয়া গ্রাম প্রায় বিলীন হতে বসেছে। ইতোমধ্যে ঘর বাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন ও সর্বহারা হয়ে পড়ছে অনেক পরিবার। ভাঙনের কবলে রয়েছে প্রায় কয়েক শতাধিক পরিবার।
গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা শায়েলা খাতুন বলেন, ‘বাড়ির কাছে চলে এসেছে নদী। সব সময় ভয়ে থাকি, কোন সময় ভেঙে যায়। এর আগে দুবার বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছি। এখন আবার সরিয়ে নিতে হবে। ভাঙনের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। স্বামী-সন্তান নিয়ে জেগে থাকি।’
এলাকাবাসী গত কয়েক বছরের ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান চেয়ে আসছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে কেবল আশার বাণী শোনানো হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
গোপালপুর ইউনিয়নের বাজড়া চরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাচুড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চরনারানদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থান মধুমতির পাড় ঘেঁষে। যে কোনো মুহুর্তে বিদ্যালয় দুটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে উপজেলার এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
উপজেলার পাচুড়িয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ চরনারানদিয়া গ্রামের কামাল শিকদার বলেন, ‘আমার বসতবাড়ি গত বৃহস্পতিবার (২৬ আগস্ট) রাতে মধুমতি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সর্বস্ব হারিয়ে পরিবার নিয়ে রাস্তার ওপর খোলা আকাশের নিচে রয়েছি। এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি।’
বাজড়া চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা পারভিন জানান, গত বছরের ভাঙনে বিলীন হতে বসেছিল বিদ্যালয়টি। জিও ব্যাগ ফেলে কোনোমতে ভাঙন রোধ করা হয়েছিল। তখন শুনেছিলাম ভাঙন রোধে এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হবে এখনও কোনো কাজ হয়নি। এবছরও নদীতে আগের মতো জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হলে বিদ্যালয়টি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
আলফাডাঙ্গা উপজেলার দায়িত্বে থাকা বোয়ালমারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) সন্তোষ কর্মকার জানান, নদীভাঙন রোধে বৃহৎ প্রকল্পের দরকার। পাউবো থেকে ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য আবেদন করে ফাইল জমা দিয়েছি। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। এছাড়া নদী ভাঙন কবলিত স্থানে ভাঙন রোধে অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদ এলাহি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসক নদী ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বন্যার সময় ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ভাঙনের বিষয়টি জানানো হয়েছে। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য সহযোগিতা করা হবে।
এদিকে জেলার চরভদ্রাসন উপজেলা সদর ইউনিয়নের ফাজেলখার ডাঙ্গী ও বালিয়া ডাঙ্গী গ্রামে পদ্মা পাড় এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি দুই গ্রামে পদ্মার ভাঙনে ১৪টি বসতভিটে, একটি রাস্তার কিছু অংশ, ফসলি জমি পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
পদ্মা নদীর ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রতিষ্ঠান তিনটি হচ্ছে সদর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালিয়াডাঙ্গী কমিউনিটি ক্লিনিক এবং চরহরিরামপুর ইউনিয়নের সবুল্লাহ শিকদারের ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
উপজেলার বালিয়া ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা খবির উদ্দিন মোল্যা বলেন, ‘কয়েকদিন পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে। ১৪টি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া শত একর ফসলী জমি নদী গর্ভে চলে গেছে।’
বালিয়া ডাঙ্গী গ্রামের আরেক বাসিন্দা ছবুর শেখ বলেন, ‘এখানকার অধিকাংশ পরিবার একাধিকবার পদ্মার ভাঙনের শিকার হয়েছি। বর্তমানে নিঃস্ব অবস্থায় বাঁধের ওপর বসবাস করছি। পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হলে আজীবন রাস্তায় পড়ে থাকতে হবে।’
চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মোতালেব হোসেন মোল্যা জানান, ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামে ভাঙনরোধে জিও-ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। বালিয়া ডাঙ্গী গ্রামেও পদ্মা নদীর ভাঙনরোধে জিও-ব্যাগ ফেলা হবে। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া চাল এবং নগদ অর্থ বিতরণ শুরু করা হয়েছে।
এদিকে গত দুই দিন ধরে স্বল্প পরিসরে পদ্মার পানি কমলেও আজ সোমবার (৩০ আগস্ট) আবার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনও বিদৎসীমার ৪৬ সে. মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফরিদপুর পাউবো সূত্র জানিয়েছে, পদ্মায় গোয়ালন্দ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বেড়েছে। বর্তমানে এই নদী পানির উচ্চতা ৯.১১ মিটার যা বিপৎসীমার ৪৬ সে.মি মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর ও ভাঙ্গা উপজেলার শতাধিক গ্রামে ফসলী ক্ষেত, রাস্তা, নিচু এলাকার বসতবাড়ি তলিয়ে রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার। পানিবন্দি এলাকায় সুপেয় পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানান, পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ভাঙন কবলিতদের মাঝেও ত্রাণ বিতরণ করা হবে।