শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৪ পূর্বাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি॥
নাম ও বাবার নাম প্রায় একই, ঠিকানা ভিন্ন হলেও দু’জন একই গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করায় চরম বিপাকে পড়েছে লালমনিরহাট সদর উপজেলা প্রশাসন।
এরা হলেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের কাজিরচওড়া গ্রামের মৃত তারিনী চন্দ্রের ছেলে মসলার ফেরিওয়ালা প্রতাপ চন্দ্র রায় এবং রংপুরের গংগাচওড়া ইউনিয়নের উত্তর ধামুর গ্রামের তারিনী কান্তের ছেলে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক(অবসর) প্রতাপ চন্দ্র রায়।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের কাজিরচওড়া গ্রামের মসলা বিক্রেতা প্রতাপ চন্দ্রকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত খবর দৃষ্টিগোচর হলে তাকে পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ। যার প্রেক্ষিতে যাচাই বাচাই শেষে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানী ভাতা প্রদানের উদ্যোগ নেয় সদর উপজেলা প্রশাসন।
এরই মধ্যে সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবু বক্কর সিদ্দিক ভাতা প্রদান না করতে লিখিত আবেদনে উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করে বলেন, ‘এই গেজেটে রংপুর সদর উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের আওতায় ৩২৯ নং বইয়ের বিপরীতে একই নামে একজন ২০১৪ সাল থেকে ভাতাভুক্ত রয়েছেন’। উপজেলা প্রশাসনের আহবানে রংপুরের ভাতাভোগী শিক্ষক প্রতাপ চন্দ্র রায় কাগজপত্রসহ হাজির হলে তার স্বাক্ষাতকারে যুদ্ধের ঘটনার বর্ণনা, দাখিলকৃত কাগজপত্র ও ঠিকানার যথেষ্ট গড়মিল দেখে সন্দেহ হয় উপজেলা প্রশাসনের। যুদ্ধের সময় কিছু দিন এই এলাকায় থাকায় ঠিকানা লালমনিরহাটের কাজিরচওড়া লিখেছেন দাবি করলেও কাজিরচওড়া গ্রামের কোথায় ছিলেন এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাননি উপজেলা প্রশাসন।
শুধু তাই নয়, সনদে তার ঠিকানা রংপুর শহরের রাধাবল্লব বলা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে রয়েছে রংপুরের গংগাচওড়া উপজেলার উত্তর ধামুর। ভাতা নিচ্ছেন রংপুর সদর উপজেলা সমাজ সেবা থেকে। এতেই শেষ নয়, লালমনিরহাটের কাজিরচওড়া গ্রামের প্রতাপ চন্দ্র রায় হিসেবে লাল মুক্তিবার্তার ৩১৪০১০৪৩৬ নং ক্রমিক ব্যবহার করলেও সনদের ঠিকানা রংপুরের রাধাবল্লব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরীত মুক্তিযোদ্ধার সনদ (নং ৩১০০৮) অনলাইনে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার এম,এ খালেক নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার তথ্য আসছে। যে সনদটি দিয়ে দীর্ঘ ৪ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ও চাকুরীতে বিশেষ কোটার সুবিধা ভোগ করে আসছেন তিনি।
সরেজমিনে রংপুরের গংগাচওড়া উত্তর ধামুর গ্রামে গেলে স্থানীয়রা জানান, শিক্ষক প্রতাপ চন্দ্রের বাবার নাম তারিনী কান্ত রায়। যুদ্ধের সময় তিনি নিজ গ্রামেই ছিলেন এবং গংগাচওড়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তিতে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
কথা হলে শিক্ষক প্রতাপ চন্দ্র বলেন, ১৯৯৯ সালে লালমনিরহাটের একজন মুক্তিযোদ্ধার সহায়তায় আবেদন করেন। ২০০০ সালে যাচাই বাচাই শেষে তাকে সনদ দেয়া হলে ২০১৪ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতাভুক্ত হন। তার সনদে অনলাইনে অন্যজনের তথ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সনদপত্র প্রদানকারীরা প্রতারনা করেছেন। সমস্যা হলে ভাতা উত্তোলন করব না’। তবে নিউজ প্রকাশ না করতে এ প্রতিবেদককে অনৈতিক সুবিধা দেয়ারও চেষ্টা করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের লাল মুক্তিবার্তার ৩১৪০১০৪৩৬ নং ক্রমিক এবং ২০০৫ সালের ৩০ মে প্রকাশিত বেসামরিক গেজেটের ৫১৪৫ নং পৃষ্ঠার ৪৯৭ নম্বরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রয়েছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের কাজিরচওড়া গ্রামের মৃত তারিনী চন্দ্রের ছেলে প্রতাপ চন্দ্র রায়। এই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজিরচওড়া গ্রামের মসলার ফেরিওয়ালা প্রতাপ চন্দ্র রায় লালমনিরহাট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ৩৩৪ নং ভোটার। তিনিও সম্মানী ভাতার জন্য কয়েক বছর ধরে সংসদ কমান্ডের নেতা ও সরকারী বিভিন্ন দফতরে ঘুরছেন।
মসলা বিক্রেতা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, সম্মানীর জন্য নয়, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেখে যেতে চাই।
লালমনিরহাটের হারাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক জানান, কাজিরচওড়া গ্রামে মৃত তারিনী চন্দ্র রায়ের ছেলে প্রতাপ চন্দ্র রায় নামে একজন ব্যক্তিই রয়েছেন। যিনি ফেরিওয়ালা হিসেবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে গরম মসলা বিক্রি করেন। ভাতা না পাওয়ার কারন তার জানা নেই। তবে তাকে ভাতার আওতায় আনা খুবই প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) জয়শ্রী রানী রায় জানান, একই নামে দু’জন দাবি করায় জঠিলতা দেখা দিয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে পুনর্বাসন এবং ভুয়াকে সনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সনদ, ঠিকানা ও যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনায় শিক্ষক প্রতাপ চন্দ্র রায়ের কোন মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।