বুধবার, ১০ Jun ২০২৬, ০১:২৫ পূর্বাহ্ন
রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি ॥
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার রাতোর ইউনিয়নে একটি ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাসের কারণে আমবাগানসহ বিভিন্ন কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, ইটভাটার ধোঁয়ায় তাঁদের কয়েক একর জমির ফসল ও ফলগাছ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে তাঁরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে শুনানির প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, উপজেলার শিমুলবাড়ী এলাকায় অবস্থিত লিয়াকত হোসেনের মালিকানাধীন ‘লিপা ব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও ধোঁয়ার কারণে আশপাশের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৫ একর জমির আমবাগান এবং অন্তত ১০ একর জমির বিভিন্ন খাদ্যশস্যের ক্ষতি হয়েছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সেকেন্দার আলী মাস্টার জানান, গত ১ মে তাঁর প্রায় ১ একর ৬৯ শতক জমির আমবাগানসহ করলা, লাউ ও ভুট্টা ক্ষেত ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি দাবি করেন, শুধু তাঁর আমবাগানেই প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সেকেন্দার আলী বলেন, ফলন ভালো হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই গাছের পাতা ঝলসে যেতে শুরু করে, আম ঝরে পড়ে এবং সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। পরে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এসে তদন্ত করে ক্ষতির সত্যতা পেয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছি। ব্যাংক ও কীটনাশকের দোকানের পাওনা পরিশোধ করতে না পেরে আমি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছি।
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা কৃষি অফিসে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। কৃষি বিভাগ তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিলেও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। পরে বাধ্য হয়ে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাগড় ইক্ষু সেন্টারের পাশেই নিয়মবহির্ভূতভাবে ইটভাটাটি স্থাপন করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ভাটা পরিচালনার ফলে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ, কৃষিজমির ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে ইটভাটার মালিক লিয়াকত হোসেন বলেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আমার ভাটার কারণে প্রায় ১৮ জন কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে। অধিকাংশের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা হয়েছে। তবে সেকেন্দার আলী ক্ষতির তুলনায় বেশি অর্থ দাবি করায় বিষয়টির সমাধান হয়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি যাচাই করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে ফসল ও আমবাগানের ক্ষতির সত্যতা পাওয়া গেছে এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাজিদা বেগমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে গিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঠাকুরগাঁও পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তামিম হাসান বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ইতোমধ্যে সরেজমিন তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বুধবার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কৃষিজমি ও পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই। পরিবেশগত বিধি-বিধান মেনে ইটভাটা পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে ফসল ও ফলের বাগান কৃষকদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন এলাকাবাসী।